হোম
0
কার্ট
অফার সাইন ইন
বই খোঁজা হচ্ছে...

কোনো বই খুঁজে পাওয়া যায়নি

বানান ঠিক আছে কিনা যাচাই করুন অথবা অন্য শব্দ দিয়ে খুঁজুন

প্রগতি - PROGOTY
পথের পাঁচালী - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর প্রচ্ছদ
একটু পড়ে দেখুন

1st Published, 2021

ক্যাশ অন ডেলিভারি
৭ দিনের রিটার্ন সুবিধা

পথের পাঁচালী

24 Ratings | 24 Reviews
TK. 247 TK. 290 -15% OFF

1200+ টাকার অর্ডারে পাচ্ছেন ফ্রি ডেলিভারি

প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস পথের পাঁচালী (১৯২৯)। বাংলার গ্রামে দুই ভাইবোন অপু আর দুর্গার বেড়ে ওঠা নিয়ে এই উপন্যাস।...
একটু পড়ে দেখুন
ক্যাশ অন ডেলিভারি
৭ দিনের রিটার্ন সুবিধা

বইটির বিস্তারিত দেখুন

প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস পথের পাঁচালী (১৯২৯)। বাংলার গ্রামে দুই ভাইবোন অপু আর দুর্গার বেড়ে ওঠা নিয়ে এই উপন্যাস। এই উপন্যাসের ছোটদের
রিপোর্ট ইনকারেক্ট ইনফরমেশন
Title পথের পাঁচালী
Author বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
Publisher প্রিয়মুখ
Edition 1st Published, 2021
Number of Pages (পৃষ্ঠা সংখ্যা) 240
Country বাংলাদেশ
Language বাংলা
Category উপন্যাস ও সাহিত্য
Weight 0.37 Kg
ISBN 978-984-80784-2-6
রিপোর্ট ইনকারেক্ট ইনফরমেশন

বিজ্ঞপ্তি

গ্রাহকদের অবগতির জন্য বিশেষ বার্তা

প্রগতি একটি নতুন প্লাটফর্ম হওয়ায় এখনো আমাদের কোনো ওয়ারহাউজ নেই। তাই আমরা রকমারির মাধ্যমে পন্য পাঠাবো। তবে এতে আপনার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবেনা।

Reviews and Ratings

Rate this product

4.88

24 Ratings and 24 Reviews

★★★★★
21
★★★★☆
3
★★★☆☆
0
★★☆☆☆
0
★☆☆☆☆
0

পাঠকদের মন্তব্য

২৪টি
Nitisha

Nitisha , Apr 1, 2024

★ ★ ★ ★ ★
যাচাইকৃত মূল্যায়ন

"onek valo"

Md. Tanbir Rahman

Md. Tanbir Rahman , Dec 31, 2023

★ ★ ★ ★ ★

"চমৎকার লেখা"

Irfan Safayet

Irfan Safayet , Sep 7, 2021

★ ★ ★ ★ ★
যাচাইকৃত মূল্যায়ন

"খুব ভালো লেগেছে"

Habiba Sultana

Habiba Sultana , Aug 16, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নাম : পথের পাঁচালী লেখক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশনী : প্রিয়মুখ ধরন : চিরায়ত উপন্যাস পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৪০ মুদ্রিত মূল্য : ২৯০ টাকা রিভিউ দাতা : খুশি রেটিং : ৫/৫ গ্রামীণ পরিবেশে হতদরিদ্রের নিত্য দিনের অভাব, কুসংস্কার, শ্রেণিবৈষম্য, আনন্দ-বেদনা,শিক্ষাহীন ও অর্থহীন নারীর সামাজিক অবস্হান আর অবুঝ কিশোর কিশোরীর দূরন্ত শৈশবকে ঘিরেই যেন উপন্যাসের প্লট রচিত রয়েছে। যে গ্রাম বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য জীবনানন্দের কবিতায় পেতাম তাই যেন সুনিপুণভাবে সাংসারিক জীবনের সংযুক্তিতে লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সাধু ভাষায় বর্ণনা করেছেন "পথের পাঁচালী" উপন্যাসে। উপন্যাসের মূল চরিত্র অপু, দূর্গা, সর্বজয়া ও হরিহরকে কেন্দ্র করে নানান ঘটনার মাধ্যমে নিস্তেজ হয়ে আসা নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলে একটি সংসার ও চারপাশের জীবনকাহিনী। মোট তিন খন্ডে রচিত উপন্যাসের প্রথম খন্ডে (বল্লালী বালাই) সহায় সম্বলহীন বিধবা নারী ইন্দির ঠাকরুনের সাথে দূর্গার ঘনিষ্ঠতার মধ্য দিয়েই উপন্যাসের শুরু। পরবর্তীতে হরিহরের পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রার মানকে তুলে ধরে অন্য এক আমেজ তৈরী করে, যদিও তা দূর সম্পর্কের অভাবী ভাইয়ের বাড়িতে পরজীবীর মতো বসবাস আর প্রতিনিয়ত ভাইয়ের বউয়ের ( সর্বজয়ার ) কটু কথা,কাউকে আঁকড়ে ধরার বাসনায় ইন্দির ঠাকরুনের গল্প শেষ হয়। দ্বিতীয় খন্ডে (আম আঁটির ভেঁপু) ভাইবোনের এমন এক শৈশবকে তুলে ধরা হয়েছে যাদের দূরন্তপনাকে সংসারের নিত্যদিনের অভাব বেঁধে রাখতে পারে নি। গ্রামের মাঠ ঘাটে টইটই করে ঘুরে বেড়ানো থেকে শুরু করে এর ওর গাছের এটা সেটা কুড়িয়ে আনা কিংবা চুরির অভিযোগে মায়ের হাতে মাইর অথবা বকুনি, হরিহরের কাজের সন্ধান, অপু দূর্গার মাঝে ভাব আড়ি, চিরাচরিত নিয়মে পৃথিবী যাত্রার অবসানের মধ্যে দিয়ে এই অংশের সমাপ্তি ঘটে। তৃতীয় খন্ডে ( অক্রুর সংবাদ ) আবারও যেন দেখতে পাই সহায় সম্বলহীন অভাবী বিধবা নারীর প্রতিচ্ছবি। অভাবকে রুখতে যে গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল কোনো একদিন, নাড়ীর টানে কিংবা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অসহায়ের মতো সেই গ্রামে ফেরার আকুলতায় শেষ হতে গিয়েও "দিন-রাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মরণ পার হয়ে,মাস, বর্ষ, মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়।তোমাদের মর্মর জীবন-স্বপ্ন শেওলা-ছাতার দলে ভরে আসে, পথ আমার তখনও ফুরোয় না। চলে...চলে...চলে...এগিয়ে-ই চলে... অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমাকে ঘরছাড়া করে এনেছি চল এগিয়ে যাই" কথাগুলোর মধ্য দিয়েই লেখক যেন নতুন এক অদম্যকে লালন করবার চেষ্টা করেছেন। ♣পছন্দের কিছু বাক্যঃ ১. বুড়ি সে কথা হজম করিয়া লইল। এরূপ অনেক কথায় তাহাকে দিনের মধ্যে দশবার হজম করিতে হয়। সেকালের ছড়াটা সে এখনো ভুলে নাই- লাথি ঝাঁটা পায়ের তল,ভাত কাপড়টা বুকের বল। ২. মা ছেলেকে স্নেহ দিয়া মানুষ করিয়া তোলে, যুগে যুগে মায়ের গৌরবগাঁথা তাই সকল জনমনের বার্তায় ব্যক্ত। কিন্তু শিশু যা মাকে দেয়, তাই কি কম? সে নিঃস্ব আসে বটে, কিন্তু তার মন-কাড়িয়া-লওয়া হাসি, শৈশব তারুল্য, চাঁদ ছানিয়া গড়া মুখ, আধ-আধ আবোল-তাবোল বকুনির দাম কে দেয়? ওই তার ঐশ্বর্য, ওরই বদলে সে সেবা নেয়, রিক্ত হাতে ভিক্ষুকের মতো নেয় না। ৩. করুণা ভালবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মসলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা হয়। ৪. অচেনার আনন্দকে পাইতে হইলে পৃথিবী ঘুরিয়া বেড়াইতে হবে,তাহার মানে নাই। আমি যেখানে আর কখনো যাই নাই, নতুন পা দিলাম, যে নদীর জলে নতুন স্নান করিলাম,যে গ্রামের হাওয়ায় শরীর জুড়াইল, আমার আগে সেখানে কেহ আসিয়াছিল কিনা, তাহাতে আমার কি আসে যায়? আমার অনুভূতিতে তাহা যে অনাবিষ্কৃত দেশ। ৫. জীবন বড় মধুময় শুধু এইজন্য যে, এই মাধুর্যের অনেকটাই স্বপ্ন ও কল্পনা দিয়া গড়া। হোক না স্বপ্ন মিথ্যা, কল্পনা বাস্তবতার লেশশূন্য; নাই বা থাকিল সবসময় তাহাদের পিছনে স্বার্থকতা; তাহারাই যে জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তাহারা আসুক, জীবনে অক্ষয় হোক তাহাদের আসন; তুচ্ছ স্বার্থকতা, তুচ্ছ লাভ।"

Jarin Tasnim

Jarin Tasnim , Aug 16, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নাম:পথের পাঁচালী লেখক:বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় ক্যাটাগরি:বুক রিভিউ রিভিউকারী:মোছা.জারিন তাসনিম ইরা নিশ্চিন্দিপুরের একেবারে উত্তরপ্রান্তে স্ত্রী সর্বজয়া, ছয় বছরের মেয়ে দূর্গা ও দূর সম্পর্কের বোন ইন্দিরা ঠাকুরুণকে নিয়ে শুরু হয় হরিহর রায়ের পরিবারের গল্প। পথের পাঁচালী গল্পের নায়ক অপু হলেও এটি শুধু অপুর জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অতীত ও ভবিষ্যত দুই দিকেই তার অন্তহীন বিস্তৃতি। বল্লালী বালাই,আম আঁটির ভেঁপু ও অক্রুর সংবাদ এই তিনটি পর্বের সমষ্টি পথের পাঁচালী উপন্যাসটি ।প্রথম পর্ব বল্লালী বালাইয়ে লেখক কৌলিন্য প্রথা সম্পর্কে বলেছেন। সেই প্রথা অনুসারে নামজাদা কুলীনেরা এক একজন বহু কন্যার পাণিপীড়ন করতে পারতেন। স্ত্রীরা যে যার বাড়িতে অবস্থান করতেন। আর শেষ বয়সে তাদের সহ্য করতে হতো অপরের বাড়িতে গলগ্রহ হয়ে থাকার যন্ত্রণা। ইন্দির ঠাকরুণও ছিলেন তেমনি এক নামজাদা কুলীনের স্ত্রী।যাকে শেষ বয়সে অতি শোচনীয় অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তিনি ছিলেন বল্লাল সেনের যূপকাষ্ঠের অন্যতম বলি। হরিহরের স্ত্রী সর্বজয়া দেখতে টুকটুকে সুন্দর হলেও ইন্দির ঠাকরুণের প্রতি তার ব্যবহার মোটেও প্রসন্ন ছিলো না।কোথাকার কে,তার সঙ্গে সম্পর্ক খুজলেও পাওয়া যায় না,বসে বসে শুধু অন্ন ধ্বংস করছে।তবে দূর্গার মনে ছিলো পিসির জন্য অগাধ ভালোবাসা পিসির কাছে সন্ধ্যায় গল্প শোনা তার নিত্যদিনের কাজ। এভাবেই দিন কাটতে থাকে। জন্ম হয় প্রকৃতিপ্রেমিক অপুর। পাড়ার লোকেরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।কি সুন্দর গায়ের রং, চুল।দূর্গারও আনন্দের সীমা থাকে না। অপুর বয়স তখন দশ মাস। সর্বজয়ার সাথে ঝগড়া হওয়ার কারণে ঠাকরুণ বাড়ি ছেড়ে চলে যায় পাশের গ্রামে। তার তিন মাস পর জ্বরে মারা যান তিনি।ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুর সাথে সাথেই নিশ্চিন্দিপুরের সেকালের অবসান ঘটে। এরপর দ্বিতীয় পর্ব আম আঁটির ভেঁপু শুরু হয় ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুর পাঁচ-ছয় বছর পর।হরিহর রায় এখন মধ্যবয়সী,পুরোদস্তুর সংসারী।অপু ছয়-সাত বছরের ফুটফুটে বালক।স্বভাবচরিত্রে দূর্গার ঠিক বিপরীত ধর্মী। শান্তশিষ্ট, প্রকৃতিপ্রেমী। দূর্গা বেপরোয়া,মায়ের নিষ্ঠুর ভৎসনা,নির্মম প্রহার কোনোকিছুকেই গ্রাহ্য করে না সে।তবে তারা দুজনেই দুজনকে খুব ভালোবাসে।অপুর প্রকৃতিপ্রেমের হাতেখড়ি দূর্গার কাছে থেকেই। সে প্রকৃতির অপার বিস্ময় আবিষ্কার করে এবং সেগুলো লিপিবদ্ধ করে।এ সময় তার লেখক মনের পরিচয় পাওয়া যায়। দেখতে দেখতে বর্ষা আসে।দূর্গার সাথে অপু যায় নারিকেল কুড়াতে।বাড়িতে আসার পর থেকেই দূর্গার জ্বর আসে। কয়েকদিনের ব্যবধানে দূর্গা মারা যায়। দূর্গার মৃত্যুর পর হরিহর বাড়িতে আসলে সর্বজয়া বার বার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য তাগাদা দেয়।তারপর তারা কাশী যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরু হয় তৃতীয় পর্ব অক্রুর সংবাদ। কাশী গিয়ে স্যাতস্যাতে এক বাড়িতে ভাড়া থাকে তারা।সেখানে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই প্রবল জ্বরে মারা যায় হরিহর রায়।সর্বজয়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। মাসখানিক পর এক ধনী পরিবারে কাজের লোকের স্থান পায় সে।শুরু হয় তাদের নতুন জীবন। সেখানে অপু প্রতি পদে পদে সবার কাছে লাঞ্ছিত হয়।একমাত্র মেজ রানী আর তার মেয়ে লীলার কাছে সুপ্রসন্ন ব্যবহার পায় সে।তবে সবকিছুর মাঝে তার জন্মস্থান নিশ্চিন্দিপুর তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে।সে সবসময় প্রার্থনা করে যাতে নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে যাওয়া হয়। পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন-মূর্খ বালক,পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামে বাঁশের বনে,ঠ্যাঙারে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেলাঘাটের সীমানায়?তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে,গন্ডি এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশে..... দিন রাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস,বর্ষ,মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায় ..........তোমাদের মর্মর জীবন -স্বপ্ন শেওলা -ছাতার দলে ভরে আসে,পথ আমার তখনো ফুরায় না.....চলে... চলে ...চলে .....এগিয়েই চলে...... অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ...... সে পথের বিচিত্র আনন্দ -যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমায় ঘরছাড়া করে এনেছি!...... চল এগিয়ে যাই।"

Himadri Sharma

Himadri Sharma , Aug 16, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বুক রিভিউ নং (৫) 🔰বই:- পথের পাঁচালী ✒️লেখক:- বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায় ♈জনরা:- চিরায়ত উপন্যাস ♈প্রকাশনী:- প্রিয়মুখ ♈ব্যক্তিগত রেটিং:-[৯/১০]😍 〰️রিভিউ করছি:- Himadri Sharma “বাংলা উপন্যাসের ছোট একটা তালিকা হলেও ‘পথের পাঁচালী’-কে বাদ দেয়া অসম্ভব। দশখানার মধ্যে একখানা তো বটেই, পাঁচখানার মধ্যেও একখানা”— অন্নদাশঙ্কর রায়। ‘পথের পাঁচালী’ এমন একটি বাস্তব, জীবন্ত, সার্বজনীন সৃষ্টি যার স্বীকৃতি অস্কার অবধি পৌঁছেছিল। ‘পথের পাঁচালী’ প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায় রচিত বিখ্যাত একটি উপন্যাস। এটি একটি বাস্তব সামাজিক উপন্যাস। সহজ ও সাবলীল ভাষায় আমাদের সমাজের বাস্তব জীবনে ছবিটির একটি সহজ স্বাভাবিক রূপ তোলে ধরা হয়েছে এই উপন্যাসটিতে। এত সুন্দর করে চারপাশের প্রকৃতির রূপ বর্ণনা করা হয়েছে যে পড়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ঘটনা আমার চোখের সামনেই ঘটে চলছে! পাঠকদের সেই উপলব্ধির আবহকে শক্ত পাকাপোক্তভাবে তৈরি করে দিয়েছেন কারিগর বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায়। জীবনের সহজ-সরল আনন্দময় মুহুর্তগুলোর পাশাপাশি উঠে এসেছে চরম সত্য কিছু বাস্তবতা! যেগুলো না চাইলেও পাঠককে মানতে বাধ্য! সামাজিক অবস্থান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নিজের অক্ষমতাকে। আবার আপনপরের হিসেব-নিকেশ একপাশে রেখে বড় হয়ে উঠে মনুষ্যত্বের পরিচয়। লেখক এখানে এমনভাবে এমনকিছু দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়েছেন, যেন আপনার প্রকৃতির প্রেমে পড়া অবশ্যম্ভাবী কাজ! উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র দুই ভাই-বোন। তাঁরা হলো- অপু ও দুর্গা। যখন একজন পরিচারিকা তার জীবনের শেষ দিনে চলে আসে, তখন তার সামাজিক পরিস্থিতি কেমন হয়? যখন কোনো নারী অল্পবয়সে স্বামীহারা হয় এবং সমাজ তাকে আবার বিয়ে করার অনুমতি দেয় না, তখন সেই নারীর সামাজিক অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? এরকম কঠিন সব প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত সুনিপুণ ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসটি প্রকৃতপক্ষে আদি ও বর্তমান সামাজিক উত্থান-পতন ও সামাজিক কুসংস্কারের প্রতিচ্ছবি। একই সঙ্গে এই গল্পটিতে হাসি-কান্না, আনন্দ, সুখ-দুঃখ, গ্রামের সহজ-সরল-সাধারণ জীবনের গল্পরা খেলা করে! উপন্যাসের প্রথম অংশে দুটি কুসংস্কারের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে। একটি হচ্ছে বাল্যবিবাহ, অপরটি যৌতুক প্রথা। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় এ দুটি কুসংস্কারের ভয়াবহ রূপ বর্ণিত হয়েছে এখানে। যৌতুকের কবলে পড়ে নারীকে অবহেলিত, নির্যাতিত, অপমানিত, নিপীড়িত হওয়ার দৃশ্য ফুটে উঠেছে এই অংশে। উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশে ‘আম আঁটির ভেঁপু’-এ হরিহরের সন্তানদ্বয়ের (বড় মেয়ে দুর্গা ও ছোট ছেলে অপু) দুষ্টুমিষ্টি একটা সম্পর্ককে দেখানো হয়েছে। গল্পের এক পর্যায়ে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে আম চুরি করে খাওয়ার ঘটনা বলে দেওয়ার জন্য দুর্গা অপুকে বেধড়ক পেটায়। প্রতিবেশীরা তখন তাঁকে ( দুর্গা) ইচ্ছেমতো কথা শুনায়। পরবর্তীতে দুর্গার মা সর্বজয়া রাগান্বিত হয়ে ওকে বকাবকি করেন। অতঃপর গল্পের এক পর্যায়ে এসে ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুর্গা মারা যায়। উপন্যাসের শেষ অংশ ‘অত্রুর সংবাদ’-এ চিরাচরিত বাংলায় বড়লোক-গরীবের বৈশিষ্ট্যের কথা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বর্ণিত হয়েছে। অপু-দুর্গা ছাড়াও উপন্যাসে ছিল হরিহর, সর্বজয়া, নীরেন, লীলাদি, সেজ ঠাকরুন, অজয়, গুলকিসহ আরও অনেকেই। যারা একে অপরের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পর্কিত। তাঁদের অনেক কেই লেখক শুধুমাত্র চরিত্রের প্রয়োজনে না এনে বাস্তব জীবনের বর্ণনার জন্য এনেছেন। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসটিতে সাধু ও আঞ্চলিক ভাষার অসম্ভব সুন্দর সমন্বয় করেছেন লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায়। লেখকের শব্দ প্রয়োগের দক্ষতা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, উপন্যাসটি পড়ার সময় মনে হয়েছে, বাস্তব জীবনের কতগুলো চিত্র রং তুলি দিয়ে আচড় কেঁটে কেউ চোখের সামনে তুলে ধরেছে। শিশুর চোখে জগৎকে দেখার আশ্চর্য বর্ণনা উঠে এসেছে লেখকের কলমের ডগায়। উপস্থাপনা শৈলী এতটাই চমকপ্রদ ছিল যে, পড়তে যেয়ে কখনোই একঘেয়েমি মনে হয়নি আমার। প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অবিরাম ছুটে চলা, বসন্ত বাতাসে ঘুড়ি উড়ানো, প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া — ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে বর্ণিত এমন কতগুলো দৃশ্য আমাকে আমার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়েছিল। প্রতিটি পৃষ্ঠা পড়ছিলাম আর স্মৃতিতে ভাসছিল শৈশবে নিজের দুরন্তপনার কথা। কখনো কখনো মনে হচ্ছিল, আরে! এ দৃশ্যটা তো আমারই শৈশব! আমারই স্বর্ণালী শৈশব! ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসটি অনেকেরই কাছে বিয়োগ গাথা মনে হলেও লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায় তাঁর গল্পের শেষে কোনো বিয়োগান্ত কথা বলেন নি। তিনি ভবিষ্যতকে দেখিয়েছেন ইতিবাচক এই দৃষ্টিতে— “পথ আমার চলে গেল শুধুই সামনে...সামনে... দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানা ছেড়ে অজানার পানে, মহাযুগ পার হয়ে যায় পথ আমার এখনও ফুরায় না, চলে চলে এগিয়েই চলে...। অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্তকাল আর অনন্ত আকাশটা, চলো এগিয়ে যাই।” বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক এই সৃষ্টিকে কেই না পড়তে চাইবে! বইতে হাসি, বইতে বাঁচি।❣️ #happyreading"

Ashraful sharif

Ashraful sharif , Aug 16, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বই : পথের পাঁচালি লেখক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশনী : প্রিয়মুখ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৪০ ধরণ: চিরায়ত উপন্যাস মলাট মূল্য: ২৯০ রিভিউ করছি : আশরাফুল শরীফ ☆"লাথি ঝাঁটা পায়ের তল, ভাত পাথরটা বুকের বল ৷" ☆"পুণ্যিপুকুর পুষ্পমালা কে পুজে রে দুপুরবেলা? আমি সতী লীলাবতী ভায়ের বোন ভাগ্যবতী ৷" 🔹️প্রারম্ভিকা: উপন্যাস হলো জীবনের গল্প ৷ জীবন জুড়ে যেমন গল্প থাকে তেমনি গল্প জুড়ে মানুষের জীবন ৷ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ে "পথের পাঁচালী" গল্পটি জীবনের সমষ্টি ৷ মানুষের জীবনের দৈনন্দিন দুঃখ-দৈন্য দশা, সুখ, শোকের বর্ণনা ফুটে উঠেছে ৷ প্রত্যেকটি চরিত্রের মাধ্যমে বাংলার প্রত্যেক ঘরের মানুষের প্রতিদিনের জীবন তুলে ধরা হয়েছে ৷ যা পাঠ করলে অবশ্যই পাঠক বুঝতে পারবেন ৷ 🔹️লেখক পরিচিতি: বাংলা ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তিনি ১৮৯৪ সালের ১২ ই সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ৷ এবং ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঘাটশীলায় মারা যান ৷ "পথের পাঁচালী" লেখকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ৷ তিনি "ইছামতী" উপন্যাসের জন্য মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার পান ৷ লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "পথের পাঁচালী" উপন্যাসটি ইংরেজি ও ফারসিসহ বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে ৷ ■ পথের পাঁচালী বৃত্তান্ত: বিভুতিভূষণ যখন "পথের পাঁচালী" ছাপানোর জন্য যাচ্ছিলেন তখন দুর্গা চরিত্র ছিল না ৷ রেল স্টেশনে একটি ছোট মেয়েকে দেখে চরিত্রটি মাথায় আসে ৷ লেখক বাড়ি ফিরে গিয়ে চারবছর সময় নিয়ে উপন্যাসটি রি-রাইট করেন ৷ উপন্যাসটির প্রাণ হয়ে উঠে দুর্গা ৷ তার হাত ধরেই পরবর্তীতে অপু উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আসে ৷ ☆উপন্যাসটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত: 🔸️১॰ বল্লালী-বালাই: এই খণ্ডে ছয়টি পরিচ্ছেদ রয়েছে ৷ প্রত্যেকটি পরিচ্ছেদ বেশ সক্রিয় ৷ এখানে উপন্যাসের স্টাটিং ঘটে ৷ 🔸️২॰ আম-আঁটির ভেপু: ২৩টি পরিচ্ছেদে সাজানো হয়েছে এই অংশটি ৷ এই অংশে উপন্যাসের প্রধান আকর্ষণীয়তা রয়েছে ৷ বলা যায়, উপন্যাসের মূল চড়াই-উতড়াই এই খণ্ডেই স্টাটিং হয়েছে 🔸️৩॰ আক্রুর সংবাদ: সর্বমোট ছয়টি পরিচ্ছেদে বিন্যাস্ত ৷ যেখানে উপন্যাসের চরিত্রের পরিণতী ঘটেছে ৷ 🔹️পাঠপ্রতিক্রিয়া: আমার কাছে বিভূতিভূষণ মানে বাংলা সাহিত্য ৷ তার সৃষ্টিশীল লেখায় আমাকে সবসময় মূগ্ধ করে ৷ বড়, মমতা চড়ানো থাকে তার লেখার প্রত্যেকটা ভাঁজে ৷ লেখকের লেখার ধারা বিবেচনায় "পথের পাঁচালী" উপন্যাসে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি ৷ অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন লেখক ৷ এতটা ভালো লাগা ভালোবাসা ছড়িয়ে উপন্যাসের প্রত্যেকটা অংশ সৃষ্টি করেছেন ৷ এর আগে আমি অন্য বইতে এতটা আবেগ, অনুভূতির ছোঁয়া পাইনি ৷ যা বিভূতিভূষণের "পথের পাঁচালী" দিয়েছে ৷ 🔹️কাহিনী সংক্ষেপ: নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের উত্তরপ্রান্তের হরিহর রায়ের ক্ষুদ্র কোঠাবাড়ি ৷ তার পারিবারিক আর্থিক দৈন্য-দশার বর্ণনা করে শুরু হয় "পথের পাঁচালী" উপন্যাস ৷ দরিদ্র ব্রাহ্মণ হরিহর রায়ের কন্যা দুর্গা ৷ আন্তরিক সরল গ্রাম্য মেয়ে দুর্গা দারিদ্রোর মধ্যে বেড়ে উঠেছে ৷ প্রকৃতির খোলে মানুষ ৷ সারাদিন বনে জঙ্গলে ঘুরেফিরে ফল ফুল কুঁড়িয়ে সে আনন্দ পায় ৷ ভাই অপুকে নিয়ে সারাদিন বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো আর পুতুল খেলা তার কাজ ৷ দুর্গা প্রকৃতির মাঝে বিস্তার করলেও প্রকৃতি তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি ৷ অপু প্রকৃতির প্রেমে বিভোর ৷ বাবা হরিহর রায় কলিকাতায় চাকরি করেন ৷ মা সর্বজয়া দুই সন্তান নিয়ে টানাপোড়েনের সংসার পরিচালনা করেন ৷ তাদের সংসারে অন্য সদস্য ছিল ইন্দির ঠাকরুন ৷ ভাগ্য বিড়ম্বনায় তাকে বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছিল ৷ এবং তিনি মৃত্যুর মুখে পতিত হন ৷ ইন্দির ঠাকরুনের জন্য দুর্গার খুব মায়া হতো ৷ ভাই বোনের মাঝে ঝগড়া দেখিয়ে আবার আবেগ পূর্ণ মিল দেখানোতে লেখক আমাদের নিত্যদিনের ঘরের কাহিনী যেন তুলে ধরেছেন ৷ পঁচিশ তম পরিচ্ছেদে দুর্গা মারা যায় ৷ তারা বাবা বাড়ি ফিরে অপু এবং সর্বজয়াকে নিয়ে শহরে চলে যায় ৷ সেখানে হরিহর রায়ের মৃত্যু হয় ৷ সর্বজয়া মানুষের বাড়িতে কাজ করে ৷ অপু মা'র সাথে সে বাড়িতে থাকতে শুরু করে ৷ সেখানে সাথে পরিচয় হয় লীলার ৷ সে অপুকে খুব স্নেহ করে ৷ ওই বাড়িতে নানান শাসন বারণের মধ্যে অপু বড় হতে থাকে ৷ কিন্তু বোন দুর্গার স্মৃতিকে ভুলতে পারে নি ৷ উপন্যাসের আকর্ষণীয় মুহূর্ত হলো ভাই বোনের এই খুনসুটির মুহূর্ত ৷ 🔹️বইয়ের নামকরণ: বইয়ের নামকরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৷ বিশেষ করে প্রায় বেশির ভাগ পাঠকই বইয়ের নাম দেখে বই কিনে থাকেন ৷ যদিও আমি এই কথার সাথে একমত নই ৷ তবে একটি সুন্দর নাম অবশ্যই বইয়ের সুন্দরতা বর্ধিত করে ৷ এজন্য বইয়ের নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে লেখককে সূক্ষ্ম জ্ঞানের পরিচয় দিতে হয় ৷ পাঠক এই উপন্যাসে মানুষের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রেম, ভালোবাসা উপলদ্ধি করতে পারবে! ঘটনাংশের সাথে মিল রেখে বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে ৷ যার মাধ্যমে বইয়ের মূল ঘটনা ঠাহর করা যায় ৷ বইটি আমার খুব ভালো লেগেছে ৷ আশা করি বইটি অন্য পাঠকদেরও ভালো লাগবে! 🔹️আকষ্মিকতা: পঁচিশতম পরিচ্ছেদে দুর্গার মৃত্যু উপন্যাসের প্রধান আকর্ষণীয় অংশ ৷ যেখানে পাঠক মনে করুণ আঘাত করেছে ৷ তাছাড়া নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে যাওয়ার পর অপুর বাবার মৃত্যু এবং তাদের জীবনে নেমে আসা নানান কষ্ট উপন্যাসে আকষ্মিকতার জন্ম দিয়েছে ৷ 🔹️ভালো লাগা কিছু লাইন: "মুনির চিন্তা চিন্তামণি নাই অন্য আশা নিষ্কর্মা লোকের চিন্তা তাস আর পাশা ৷ ধনীর চিন্তা ধন আর নিরেনব্বইএর ধাক্কা, যোগীর চিন্তা জগন্নাথ, ফকিরের চিন্তা মক্কা, গৃহস্থের চিন্তা বজায় রাখতে চারি চালের ঠাট্টা ৷ শিশুর চিন্তা সদাই মাকে, পশুর চিন্তা পেট্টা ৷" 🔹️উল্লেখযোগ্য উক্তি: "যে জন খড় পেতে খেজুর চেটায় ঘুমিয়ে কাল কাটে, তাকে খাট-পালঙ্ক খাসা মশারি খাটিয়ে দিলে কি খাটে?" "লীলার গলার সুর কি মিষ্টি, এমন সুর সে কোন মেয়ের এপর্যন্ত শুনে নাই ৷" "চল আজ এইগুলা নিয়ে যাই, নাইবার বেলায় মাকে সঙ্গে আনবো ৷" 🔹️উপন্যাসের চরিত্র: চরিত্র হলো উপন্যাসের প্রাণ ৷ চরিত্রের মাধ্যমে সামনের দিকে উপন্যাসের বিস্তিতি ঘটে ৷ চরিত্র যতটা স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে ফুটে উঠে একজন বইপ্রেমি উপন্যাসকে ততটা সহজে গ্রহণ করে ৷ "পথের পাঁচালী" উপন্যাসের সক্রিয় কয়েকটি চরিত্র আলোচনা করছি:- 🔸️ইন্দির ঠাকরুন: নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের বাসিন্দা ৷ অপু আর দুর্গার পিসিমা ৷ উপন্যাসের শুরুতে এই চরিত্রটি ফুটে উঠেছে ৷ মাঝে তার মৃত্যু হলেও শেষ অব্দি তার রেশ রয়ে গেছে ৷ 🔸️সর্বজয়া: হরিহর রায়ের স্ত্রী ৷ বাংলা সহজ সরল গ্রাম্য বধু ৷ তিনি অপু এবং দুর্গার মা ৷ উপন্যাসের শুরুতে তাকে সহজ সরল উপস্থাপন করা হলেও শেষের দিকে বাঙালি নারীর সংগ্রামী জীবনের অঙ্কুর ফুটে উঠেছে ৷ 🔸️হরিহর রায়: নিশ্চিন্দিপুরের বাসিন্দা ৷ সর্বজয়ার স্বামী ৷ অপু এবং দুর্গার বাবা ৷ তিনি শিক্ষিত মার্জিত সহজ সরল শ্রেণীর ৷ 🔸️দুর্গা: উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র দুর্গা ৷ তার হাত ধরে উপন্যাসটি সামনে এগোয় ৷ ম্যালেরিয়া জ্বরে তার মৃত্যু হলেও উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত তার রেশ লক্ষ্য করা যায় ৷ 🔸️অপু: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ৷ এই চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যে সমধিক আলোচিত ৷ বিখ্যাত চরিত্র ৷ ছোট থেকে বড় হতে থাকা এবং জীবন সংগ্রামে আঁতাত করতে করতে চরিত্রটি পাঠক প্রিয়তা পায় ৷ 🔸️লীলা: সর্বজয়া যে বাড়িতে কাজ সে বাড়ির মেয়ে ৷ অপুর সাথে তার বন্ধুত্ব বনে যায় ৷ 🔹️উপন্যাসের শিক্ষা: প্রত্যেকটা জিনিসের আলাদা আলাদা শিক্ষা থাকে ৷ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাস "পথের পাঁচালী" ও তেমন ৷ বইটি পড়ে মানুষের জীবন, পরিবার, পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, পারিবারিক জীবনের দুঃখ-দৈন্য সহজে বুঝা যায় ৷ বইটিতে আমাদের সমাজ বাস্তবতার চিত্র শিক্ষণীয় ৷ 🔹️ব্যক্তিগত রেটিং: রেটিয়ের মাধ্যমে বইয়ের মান যাচাই করা যায় না ৷ বই সম্পর্কে জানতে হলে বুঝতে হলে অবশ্যই বইটি পড়তে হবে ৷ কারণ, পাঠক মাত্রই ভিন্ন রুচির ৷ বইটিতে আমার ব্যক্তিগত রেটিংঃ- ৫/৫ 🔹️বাংলা সাহিত্যের সেরা বইগুলর মধ্যে পথের পাঁচালি নিজের স্থান করে নিয়েছে স্বমহিমায়। বইটি পড়ে সকল পাঠকই আমার মতো তৃপ্ত হয়েছেন । যা লেখকের অন্যতম সফলতা ৷"

Sefaat Hasan Sumaiya

Sefaat Hasan Sumaiya , Aug 15, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বই- পথের পাঁচালী লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশনীঃ প্রিয় মুখ দামঃ ১৭৪ ক্যাটাগরিঃ বুক রিভিউ রিভিউকারীঃ সিফাত হাছান সুমাইয়া প্রিয় পাঠক, আপনি কি সামাজিকতার বাস্তব দিকগুলো আপনার পঠিত কোন উপন্যাসের মধ্যে খুঁজে নিতে চান? তাহলে প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর “পথের পাঁচালী” হবে কার্যকর একটি উপন্যাস। সেই সাথে মজার বিষয় হচ্ছে, এটি যে একটি উপন্যাস তা আপনি পড়তে পড়তে ভুলতে বসবেন। কেননা এই উপন্যাসে লেখক খুব স্বচ্ছ-সাবলীল ভাষায় আমাদের সমাজের বাস্তব ও জীবন্ত রূপ তুলে ধরেছেন। এই বইটিতে লেখক সাধারণ থেকে অসাধারণ প্রতিটি দৃশ এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে আপনি হয়তো পড়া শেষে একজন ভালো মাপের প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে উঠবেন। পথের পাঁচালী এমন একটি উপন্যাস যা থেকে আপনাদের কিছু বিষয়ে ধারণা তৈরি হবে। এই সমস্ত ভাবনা আমাদের সমাজের কারও মাথায় হুট করে আসে না। আমাদের এই সমাজ হুট করে ভেবে উঠতে পারে না একজন নারীর জীবনচক্র। নারীর আত্মমর্যাদা, জীবনযাপন, সামাজিক নিরাপত্তা, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা- এসব ব্যাপারে অধিকাংশই ভাবে না বিশেষ কিছু। একজন নারী বিধবা হলে পরে তার দ্বিতীয়বার বিয়ে দেয়া যাবে না! তাহলে কী করে চলবে তার জীবন? তার তো নিজস্ব কোন পরিচয় কিংবা আয় নেই! এই চিন্তাটা ভেবেছে কয়জন? একজন গরীব দিন এনে দিন খাওয়া নারী কী করবে তার শেষ বয়সে? তার তো জমানো কোন টাকা নেই! এই দিকটাও সকলের ভাবনার বাইরে। এই উপন্যাস আপনাকে সেই সব দুর্বল, নিপীড়িত নারীদের নিয়ে ভাবতে শেখাবে! চিরায়ত বাঙালি পরিবারের আপাদমস্তক দৃশ্যকে অবলম্বন করে রচিত এই উপন্যাসে দুইটি ধাপ রয়েছে- উপন্যাসের প্রথম অংশে চোখে পড়ে এই সমাজের প্রচলিত অন্যায়ের দৃশ্য। তৎকালীন সমাজের একটি অন্যতম চিত্র ছিলো বাল্যবিবাহ এবং যৌতুক প্রথা। এই সমস্ত সমস্যা তার হরেক ডালপালা ছড়িয়ে যে বাড়তেই থাকত তা এই উপন্যাসে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। খুব অল্প বয়সে ইন্দিন ঠাকুরনের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু তার বর পরবর্তীতে বেশি যৌতুকের লোভে অন্যত্র বিয়ে করে। পরে সেই আয়হীন, স্বামীহীন ইন্দিন ঠাকুরনের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তার আর নির্দিষ্ট করে কোন আশ্রয় থাকে না। তার পিতার বাড়িতে এবং তাদের ও তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার দূরসম্পর্কের আত্মীয় হরিহরের বাড়িতে স্থান হয়। সেখানে প্রতিমুহূর্তে মনে করিয়ে দেওয়া হতো সে একজন আশ্রিতা, করুণার পাত্রী ছাড়া আর কেউ নয়। সে প্রায়শ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। কিন্তু দিন শেষে তার পথ এসে শেষ হতো হরিহরের বাড়িতে। একবার ঘটনাক্রমে বাড়ি থেকে তাকে একেবারে বের করে দেয়া হয়! উপন্যাসের এই ইন্দিন ঠাকুরন আর কেউ ই নন- আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা হাজারও অসহায় নারীর প্রতীকী রূপ মাত্র! তারপর, উপন্যাসের ২য় অংশ “আম আঁটির ভেঁপু”তে অত্যন্ত সুচারুভাবে হরিহরের সন্তানদ্বয়- বড় মেয়ে দূর্গা ও ছোট ছেলে অপুর টক-মিষ্টি সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। দস্যি দূর্গা সারাদিন বনে বাদারে ঘুরে বেড়ায়, ফল চুরি করে এনে পিসীকে দেয় আর ওদিকে বিচার যায় মায়ের কাছে। উত্তম মধ্যম পড়ার পরও কমে না তার দস্যিপনা। অপু দূর্গার একনিষ্ঠ ভক্ত। দিদির ফল পাকুড়ের ভাগ নেয়া থেকে শুরু করে বড় মাঠের ওধারে রেলগাড়ি খুঁজতে যাওয়া- সবকিছুর সঙ্গী সে। পাঠশালায় সবচেয়ে ছেলেমানুষ কিন্তু পড়াশোনায় বেশ। মিষ্টিওয়ালার পিছু নেয়া, দিদির চড়ুইভাতির সঙ্গী হওয়া সবকিছুতেই অপু কেমন মুখচোরা। তবে দূর্গার জন্য মায়াটা তার প্রচণ্ড। এই নিস্তরঙ্গ জীবনেও একদিন ঢেউ ওঠে। দূ্র্গার অসুখ ভালো হওয়ার নাম নেই। সংসারে আয় রোজগার নেই। ভাগ্যের অন্বেষণে শুরু হয় আরেক যাত্রা। সেখানে ফড়িং জীবন পেছনে ফেলে হাঁটতে হয় বাস্তবতার কঠিন পথে। আম আটির ভেপুঁ, ভাটফুল, বৈচির ঝোপ আর হাতছানি দিয়ে ডাকে না। হরিহরের চাঁদের হাট সংসারে ধেয়ে আসে কালো মেঘ। জীবনের সহজ সরল আনন্দময় মুহূর্তগুলোর পাশাপাশি উঠে এসেছে চরম সত্য কিছু বাস্তবতা। যা না চাইলেও মেনে নিতে মানুষ বাধ্য হয়। সামাজিক অবস্থান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নিজের অক্ষমতাকে। আবার আপন পরের হিসেব নিকেশ একপাশে রেখে বড় হয়ে উঠে মনুষ্যত্বের পরিচয়। এই উপন্যাসের শেষ দিকে একটা অংশ রয়েছে। যেখানে, “অক্রুর সংবাদ”-এ চিরাচরিত বাংলার, এই মিথ্যার আদলে গড়ে ওঠা সমাজে ধনী-গরীবের বৈষম্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে সাফল্যের সাথে দেখানো হয়েছে যে একজন ব্রাহ্মণ নারীর (সর্বজয়া) কী অবস্থা হয়, যখন অর্থের জন্য তাকে গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়। দুর্গার মৃত্যুর পর তারা গ্রাম ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। সেখানে এক পর্যায়ে জ্বরে স্বামী হরিহরও মারা যায়। তার চোখের অশ্রু মোছার জন্যও কেউ ছিল না। সবাই তার কষ্টের সুযোগ নিতে চায়। সাহায্যের হাত কেউ বাড়ায় না। অবশেষে সে অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ছেলে অপুকে নিয়ে তার নিজ গ্রাম নিশ্চিন্দিপুরের পথে রওনা হয়। কিন্তু সে তার সঠিক পথ খুঁজে পায় না। পাঠক তাহলে বুঝতেই পারছেন এই উপন্যাস আমাদের বাস্তব সমাজ ব্যবস্থার কুসংস্কার আর অন্যায়েরই প্রতিফলন। লেখক এখানে তৎকালীন সমাজের কথা উল্লেখ করলেও আমাদের তথাকথিত বর্তমান আধুনিক সমাজও এই ধরনের সামাজিক উত্থান-পতন থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি।"

Sumaia Nur Misoury

Sumaia Nur Misoury , Aug 14, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নামঃ পথের পাঁচালী লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ধরনঃ বিয়োগান্তক সামাজিক উপন্যাস রিভিউঃ সুমাইয়া নুর মিসৌরী বাংলা ক্লাসিক উপন্যাস পড়তে যারা ভালবাসেন, তাদের কাছে নিশ্চিন্দিপুর হয়ত একটি পরিচিত গ্রাম। গ্রামের প্রকৃতি আর মানুষজন যেন বড়ই চেনা তাদের কাছে। হ্যাঁ, লিখছি প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী' নিয়ে। গ্রামের সহজ সরল কিছু মানুষের জীবনের উত্থান-পতন ও প্রকৃতির রূপ বর্ণনার এক অসাধারণ সমন্বয় এই উপন্যাসটি। সমগ্র উপন্যাসটি তিনটি খন্ডে এবং পঁয়ত্রিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। খন্ড তিনটি যথাক্রমে- বল্লালী বালাই, আম আঁটির ভেঁপু এবং অক্রূর সংবাদ। 'বল্লালী বালাই'- প্রথম খন্ডটির প্রধান চরিত্র ইন্দির ঠাকরুণ। এখানে 'বল্লালী বালাই' বলতে লেখক রাজা বল্লাল সেন প্রবর্তিত কৌলিন্য প্রথা কে বুঝিয়েছেন, যার শিকার এই ইন্দির ঠাকরুণ। অল্পবয়সে স্বামীহারা এবং কঠিন অবহেলার শিকার এই অসহায় নারীর শেষ ঠাঁই হয় দূরসম্পর্কের আত্মীয় হরিহরের বাড়িতে। হরিহরের স্ত্রী সর্বজয়ার কাছে চরম অপমানের শিকার হন ইন্দির ঠাকরুণ। তবে সর্বজয়ার মেয়ে দুর্গার সঙ্গে তার বড় ভাব। সর্বজয়ার অপমানের তাড়নায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যান এই বৃদ্ধা অসহায় নারী। কিন্তু বেশিদিন কোথাও মন টিকে না বলে তার পথ এসে ঠেকত সেই সর্বজয়ার সংসারেই। ঘটনাক্রমে ইন্দির ঠাকরুণ এর মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই মর্মান্তিক ইতি ঘটে প্রথম খন্ডের। উপন্যাসটির দ্বিতীয় খন্ড- 'আম আঁটির ভেঁপু' হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় খন্ড এবং নিঃসন্দেহে উপন্যাসটির প্রাণ। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা দুই ভাই বোন অপু, দুর্গা ও তাদের বাবা মা এর টানাপোড়েনের সংসারে পাঠক খুঁজে পাবেন এক গ্রামীণ নিম্নবিত্ত পরিবারের অকৃত্রিম মায়া। মা সর্বজয়া চাইলেও তার সন্তানদের মুখে ভাল খাবার তুলে দিতে পারেন না। নীরবে মর্ম ব্যাথায় ব্যাথিত হন এই দুঃখিনী মা। তাদের বাবা হরিহর একজন কুলীন ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও প্রচন্ড অর্থাভাবে সংসার চালাতে হয় তাকে। কালবৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানো, সেজো জেঠীমার বাগানের নারকেল চুরি করে আনা, মায়ের মুখে অপুর মহাভারত শোনা, আপন মনে কুরুক্ষেত্রের কাহিনী আওড়ে বেড়ানো, দূরে রেললাইন দেখতে যাওয়া- এসব অতি সাধারণ ঘটনাগুলিও যেন লেখকের অসাধারণ লেখনীতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, যা পাঠকের মনে এক অন্যরকম ভাললাগার জন্ম দেবে। একইসাথে পাঠক কষ্ট পাবেন দুই কোমলমতি শিশুর জীবনের দুঃখ দূর্দশা দেখে। সর্বোপরি, বিনা চিকিৎসায় দুর্গার মৃত্যুতে পাঠক মনে করুণ এক আবেগের উদ্রেক হবে। এমনকি কতিপয় পাঠক চোখে অশ্রু সঞ্চয় ও হতে পারে। মনে হতে পারে, লেখক এতটা করুণ পরিণতি না লিখলেও পারতেন! প্রাণপ্রিয় দিদি কে হারিয়ে বড় একা হয়ে পড়ে সদাচঞ্চল অপু। সমাপ্ত হয় দ্বিতীয় খন্ড। তৃতীয় খন্ড- 'অক্রুর সংবাদ' এ বর্ণিত হয়েছে সন্তান হারানো পিতা মাতা ও বোন হারানো ভাই এর পরবর্তী জীবনের কিছু অংশবিশেষ। অপু তার পিতামাতার সাথে পাড়ি জমায় কাশীতে। সেখানে গিয়ে নিউমোনিয়ায় তার পিতৃবিয়োগ ঘটে। নিরুপায় মা সর্বজয়া রাঁধুনীর চাকুরী নেন এক ধনী গৃহস্থের বাড়িতে। সেখানেও দীর্ঘদিন ঠাঁই হয়নি তাদের। ধনী গরীবের ভেদাভেদ তাদের কে টিকতে দেয় নি সেখানেও। ফিরতে হয় নিশ্চিন্দিপুর গ্রামেই। সামাজিক বৈষম্য, বিষয়টি আদি এবং চিরন্তন। দিন কেটে যাবে, যুগ পাল্টাবে কিন্তু বৈষম্যের অবসান হয়ত কোনোদিনই ঘটবে না। 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসটি তে তৎকালীন সমাজের যে ধনী গরীব বৈষম্য ফুটে উঠেছে, বর্তমান সমাজেও তা পরিলক্ষিত হয়। যদিওবা প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বস্তুত, আদি ও বর্তমান সমাজের প্রচলিত বৈষম্যের বিম্ব গুলোই প্রতিফলিত হয়েছে উপন্যাসটি তে। সর্বোপরি, লেখকের বর্ণনাশৈলীর গুণে পাঠক মনে উপন্যাসটির এক কাল্পনিক দৃশ্যপট তৈরী হবে। পাঠক যেন চোখের সামনে দেখতে পাবেন প্রতিটি চরিত্র কে। উপন্যাসটি পাঠকের ভাল লাগবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই যারা পড়েন নি, আমন্ত্রণ রইলো উপন্যাসটি পড়ার। পাঠক মনে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর এই কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'।"

Mahira

Mahira , Aug 12, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 যে কালজয়ী সৃষ্টিগুলো বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়কে আজ প্রায় শতবর্ষ পরেও সাহিত্যের বিশাল অঙ্গনে সমভাবে জনপ্রিয় করে রেখেছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- 'পথের পাঁচালী'। অনেকেই অবশ্য একে বিভূতিভূষণের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে আখ্যায়িত করতে নারাজ, তবে বহুল জনপ্রিয় উপন্যাস বলতে কোনো দ্বন্দ্ব নেই খুব সম্ভবত। শুধু এক 'পথের পাঁচালী' দিয়েই বিভূতি বাবু আজন্ম টিকে থাকবেন বাঙালি পাঠকদের হৃদয়রাজ্য জুড়ে। নিশ্চিন্তিপুর গ্রামের হতদরিদ্র হরিহরের পরিবারের নিদারুণ অভাবের জীবনই উপন্যাসের উপজীব্য। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হরিহর, তার স্ত্রী সর্বজয়া, তার এক কন্যা দূর্গা আর এক পুত্র অপু। হরিহরদের জীবনের অসমান্তরাল পথ, সেই পথের বাঁকে বাঁকে উদিত হওয়া একেকটা গল্প, ভিন্নভাবে পথচলা, যার সবটার সমন্বয়ে আমাদের 'পথের পাঁচালী '। উপন্যাসটি মোট তিনটি উপশিরোনামে বিভাজিত- • বল্লালী বালাই • আম আঁটির ভেঁপু • অক্রুর সংবাদ। - তৎকালে উপন্যাসের যে প্রচলিত বৃত্ত ছিলো, যে বৃত্তকে আবর্তন করেই উপন্যাস লিখেছেন বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শরৎ বাবু, শরৎ বাবু থেকে নিয়ে রবিঠাকুর, 'পথের পাঁচালী' হচ্ছে সেই বৃত্তের একদম বাইরের উপন্যাস। চরিত্রায়নে কোনো জাঁকজমক নেই, নেই মোড় ঘুরানো টুইস্ট কিংবাব নাটকীয় সংলাপের বাহার, অথচ কি ভীষণ ভাবে পাঠক ধরে রাখার সক্ষমতা আছে এই উপন্যাসের, তা বলে বোঝানো দুঃসাধ্য। একটা উপন্যাসেই একসাথে উঠে এসেছে ভারতীয় পল্লীজীবন, সমষ্টিগত শৈশব আর জীবনের নানাবিধ টানাপোড়েনের গল্প। অভাবের জীবন, সমাজের প্রথাগত ক্রুরতার মধ্যে দিয়ে বালক অপুর জন্ম থেকে বেড়ে উঠা। উপন্যাসের সূচনা পর্বের বিস্তার এ নিয়েই। সেই সাথে দেখা যাবে সমাজের কৌলীন্যপ্রথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠার প্রতিফলনস্বরূপ ইন্দির ঠাকুরণকে, যার অল্পবয়সে এমন এক লোকের সাথে বিয়ে হয় যে কিনা অধিক যৌতুকের লোভে অন্যত্র বিয়ে করে ফেলে। অসহায় ইন্দির ঠাকুরণের তখন স্থান হয় দুঃসম্পর্কের আত্মীয় হরিহরদের বাড়িতে। ইন্দির ঠাকুরণকে পদে-পদে মনে করিয়ে দেওয়া হতো, সে একজন আশ্রিতা। ভাগ্যও অসহায়ত্বের সুযোগে পরিহাসে লিপ্ত হয় কিনা! অবশ্য, এই অবহেলার কষ্টটুকু যেন দূর্গাই পুষিয়ে দিতো। মায়ের রক্তচক্ষু চাহনী কিংবা বকুনী উপেক্ষা করে বৃদ্ধা পিসির সাথে তার ছিলো গলায় গলায় ভাব। প্রায়ই ইন্দির ঠাকুরনকে ঝগড়ার কারণে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখা যেতো, কিন্তু বেলাশেষে তার গন্তব্য ওই সর্বজয়ার চৌকাঠে এসেই ঠেকতো। . পাঠকের হয়তো মনে হতে পারে, ইন্দির ঠাকুরণের অংশটুকু বাহুল্য। অনেক সমালোচকও 'বল্লালী বালাই' পুরো অংশটাকেই বাহুল্য বলেছেন। তবে আমার বিশ্বাস, সম্পূর্ণ উপন্যাস পাঠান্তে পাঠকমনে সেই ধারণার ভীত ভঙ্গুর হয়ে যাবে বলে । বরং মনে হবে, বল্লালী বালাই ছাড়া উপন্যাসটি অসম্পূর্ণই রয়ে যেতো। তিন কালের যোগসূত্রের জন্য ইন্দির ঠাকুরণ চরিত্র সৃষ্টি যথার্থই ছিলো। ইন্দির ঠাকুরণের মৃত্যুর সাথে ঔপন্যাসিক অতি সুচারুভাবে ঐতিহ্যসমেত এক প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেন মহাকালের অন্তে। দূর্গার হাত ধরে যে অপু শিখেছিলো প্রকৃতির ভাষা, সেই অপুর বালকহৃদয়ে প্রকৃতির সাথে নিবিড়তা ফুঁটে উঠে উপন্যাসের মধ্যপর্বে। এখানে যেন লেখক অপুর চোখ দিয়ে পাঠকদের দুনিয়া দেখানোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। পরস্পরের অন্তঃপ্রাণ ভাইবোন অপু ও দু্র্গার টকমিষ্টি সম্পর্ক, চঞ্চল শৈশবই এখানের প্রতিপাদ্য। সেই রেললাইন, মাকাল ফল কুড়ানো, শকুনির ডিম সংগ্রহ, চড়ুইভাতির উৎসুক প্রতীক্ষা, কল্পরাজ্যে বিচরণ, ভাঙা স্বপ্নে নতুন আবরণ, অদৃষ্টের নিষ্ঠুরতা ছাপিয়ে অপুর ভেতরে জাগ্রত হওয়া এক টুকরো জীবনবোধ নিয়েই 'আম আটির ভেঁপু '। পল্লীজীবনের সবটুকু শৈশব যেন মাখামাখি করে অপু-দূর্গাতে, যার কারণে উপন্যাসের এই অংশটি হয়ে উঠে সবচেয়ে প্রাণবন্ত। তবে, আচমকা দূর্গার মৃত্যু যেন সেই প্রাণারণ্যে ছেয়ে যায় একরাশ শূন্যতায়। অন্তিমপর্বে চিত্রিত হয়েছে হাজারো গল্পে ভরা নিশ্চিন্তিপুরের স্মৃতি বাক্সবন্দি করে, অপুদের কাশীবাসী হওয়ার যাত্রার উপাখ্যান। সেখানে শ্রেণীবৈষম্যের এক বাস্তবিক চিত্রপট তুলে ধরা হয়, পাঠকহৃদয় যেটা প্রকৃতই অনুধাবন করতে পারবেন। এই সবকিছু মাড়িয়ে আবার সেই নিশ্চিন্তিপুরের দিকে পা বাড়ানো। বাক্সবন্দী স্মৃতিরা শতদল প্রজাপতির মতন ডানা ঝাপটায় আবারো। তারপর? তারপর আরেকটা মৃত্যু! একটুতে সুখে থাকা মানুষগুলোর জীবনে জড়ো হয় আজন্ম হাহাকার! যেন ঠোঁট মুড়ে কান্না আটকানোর মতো চাপা কষ্ট অনুভবের আয়োজনে পথের পাঁচালী এগিয়ে চলে তার নিজস্ব নিয়মে। . একটা বই, অথচ কত মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিয়েছে হৃদয়ের আনাচে-কানাচে, সেটা বোঝানোর জন্য বোধকরি যথেষ্ট শব্দের মজুদ নেই আমার মস্তিষ্কের ভান্ডারে। খুবই সাদাসিধে কাহিনী, অথচ কি বিশাল তার ভাবের জোর! জীবনের জটিলতা বুঝতে না পারা অপুর অনুসন্ধিৎসু দুটি চোখে পৃথিবীকে দেখতে না পারলে বুঝি পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য রয়ে যাবে দৃষ্টির অন্তরালে। সেই প্রলম্বিত দুপুর, এলিয়ে পড়া বিকেলগুলো, প্রকৃতির সূক্ষ্ম সৌন্দর্যগুলোও যার চোখজোড়া এড়িয়ে যায়না, সেই চোখের বিস্মিত চাহনী তো গুটিকয়েক বাক্যে প্রকাশ করা যায় না। প্রয়োজন হয় প্রেক্ষাপটের, চরিত্র চিত্রায়ণ কিংবা আবহের, নানা ঘটন-অনুঘটনের। সেই ঘটনাগুলো জীবন্ত। কখনো অপুর সাথে চলে যেতে হয় সোনাডাঙার মাঠে, কখনো প্রসন্ন মুদির পাঠশালায়, কখনোবা বেত্রাবতী নদীর তীরে। পাতা উল্টাতে উল্টাতে উপন্যাস শেষ হয়ে যায়, তবুও হৃদয়ের অলিন্দ-নিলয় জুড়ে থেকে যায় অমীমাংসিত অনুভূতির রেশ। চিরায়ত পথচলার চিরচেনা পল্লীর নিতান্তই সাধারণ এক দম্পতির সংসার আর তাদের সন্তানদ্বয়ের প্রাণবন্ত জীবনাচরণই পথের পাঁচালীর মুখ্য বিষয়। মহাকালের গতিপথের উৎসমূল সন্ধান আর শিশুমনের বিস্ময়-চেতনার সঙ্গে বিভূতি বাবুর জীবনবোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কোনো টানটান উত্তেজনা নেই, নেই অতিরঞ্জিত বর্ণনার ঘনঘটা, বরং ঔপন্যাসিকের মন মোহনীয় সৌন্দর্যের আকুলতা কিংবা অপ্রিয় প্রস্থানের নিভৃতচার কলমের ডগার তুলে আনতে ব্যস্ত। চরিত্রগুলোও বড্ড জীবনঘনিষ্ঠ। হরিহর-সর্বজয়া, অপু-দূর্গা কিংবা ওই ইন্দির ঠাকুরণ আমাদের আশেপাশেরই চেনামুখগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। সেই চেনামুখগুলোকেই বিভূতি বাবু সাজিয়েছেন অতি সযত্নে। প্রতিটি দৃশ্য ও চরিত্রের জীবন্ত উপস্থাপনা এই উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে বিভূতিভূষণ অপ্রাঞ্জল বর্ণনায় জটিল করেননি উপন্যাসের প্রবাহ। তার বর্ণনাশৈলী একেবারে সহজাত, অকৃত্রিম ও প্রাঞ্জল। সেই সাথে চরিত্র গুলোর বাস্তবজীবন আর কল্পনার মেলবন্ধনে তিনি যে অসাধারণ এক জগৎ করে তুলেছেন, সেই জগতের চমৎকার চিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঔপন্যাসিকের স্বকীয় সাহিত্যগুণ। গ্রাম্য প্রকৃতি বলতে বিশেষ কিছু নেই, সেই পাতাবাহার, গুল্মলতা, নদীর কল্লোল, বুনোহাঁসের দল, কিশোরদলের দাপাদাপি, রাজহংসীদের জলকেলি, গৃহস্থ বাড়ির কর্মচাঞ্চল্য চিরায়ত সবকিছুই। অথচ বিভূতিভূষণের কলমের ছোঁয়ায় যেন সেই চেনা গ্রাম হয়ে উঠেছে অদ্ভুত মনোহর। ঔপন্যাসিকের প্রকাশভঙ্গি এতোটা সুনিপুণ, যার কোনো তুলনা হয়না। সুন্দর চিরসত্য। এই সুন্দরের কোনো ডেফিনেশন নেই, আছে কেবল অনুভূতি। সেই সুন্দরের অনুভব পাঠকমাত্রই এও উপন্যাসে হৃদয়াঙ্গম করবে আদ্যোপান্তে। সাদামাটা বর্ণনার ভাষাতেও কাব্যমাহাত্ম্য যেন জীবনের রূপ রস গন্ধের প্রতীকী চরিত্র হিসেবে দাঁড় করা হয়েছে পাঠকের সামনে। নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম যেন আমাদেরই গ্রাম, অপু দূর্গাতে যেন আমাদের সমষ্টিগত শৈশব। একটি শিশুর ছোট থেকে বড় হতে বাস্তবতা ঋদ্ধ যেসব অভিজ্ঞতা দ্বারা স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাঠ শিখিয়ে দিল পথের পাঁচালী, তা আমাদের কোনো প্রচলিত পাঠ্যপুস্তক থেকে মিলবেনা। একারণেই পথের পাঁচালীর কাছে আমাদের যেতে হয় বারংবার। ছোটবেলায় যেতে হয় অপু-দূর্গার হাত ধরে বাস্তবতার রকমফের চিনতে, আর বড়বেলায় যেতে হয় শৈশবের মধুর স্মৃতি আওড়িয়ে নস্টালজিক হতে। কি নেই পথের পাঁচালীতে? একে যদি জীবনবোধের পাঠ বলি তবুও ভুল হবে না, যদি বলি কোনো বিয়োগান্তক কাহিনী তাও ষোলোআনাই যথার্থ হবে। সমাজ, সমাজভাবনা আর প্রকৃতি ভাবনা সবগুলোকে এতো নিখুঁত চিত্রায়ণ করেছেন ঔপন্যাসিক, যে পথের পাঁচালীর আবেদন ফুরাবে না কোনো কালে। প্রয়াত ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদের ভাষায়- ❝বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালীতে একবার এবং চিরকালের জন্য একটি কাজ করে গেছেন; তিনি পল্লীর অমল সরল কল্পনামথিত রোমান্টিক কোনো বালককে নিয়ে উপন্যাস লিখার সমস্ত পথ বন্ধ করে গেছেন। তাকে আমরা ফিরে ফিরে পেতে পারিনা।❞ . ______ বইয়ের নাম: পথের পাঁচালী লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় প্রকাশনী: প্রিয়মুখ রিভিউয়ার : মাহিরা ইশক্ব"

Marjana Badhon

Marjana Badhon , Aug 11, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নাম:পথের পাঁচালী লেখক:বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ধরণ: আত্মজৈবনিক উপন্যাস পারসোনাল রেটিং:৯/১০ “নিশ্চিন্দিপুর আমাদের বড় ভাল গাঁ, এমন নদী, এমন মাঠ কোথাও নেই”;এমন এক ছবির মতন গাঁয়ে অপু ও দুর্গার শৈশব যেন গ্রাম-বাংলার শাশ্বত চিত্র।‘বল্লালী বালাই’, ‘আমি আঁটির ভেঁপু’ ও ‘অক্রুর সংবাদ’ এই তিন পরিচ্ছেদে বিভক্ত বইটিতে কখনো আমরা দেখেছি দুর্গা ও অপুর মা সর্বজয়ার মাতৃ-মূর্তি, কখনো বাবা হরিহরের সংগ্রাম আবার কখনো বা ইন্দির ঠাকরুণের অস্তিত্বের ইতিহাস।তবে সবকিছু ছাপিয়ে শৈশব-জীবনের মাধুর্য ও গ্রামীণ আবহই পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখে বেশীরভাগ সময়ে।ইন্দির ঠাকরুণ যেন এক অন্যকালের প্রতিনিধি।“তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেকালের অবসান হইল”। দুর্গার চিত্র আঁকতে ফিরে যাওয়া যায় বইয়ের বর্ণনায়।“ছেলেমেয়ের সঙ্গে তাহার বড় একটা খেলা-ধুলা নাই।কোথায় কোন ঝোঁপে বৈচি পাকিল,কাদের বাগানে কোন গাছটায় আমের গুঁটি বাধিয়াছে,কোন বাঁশতলায় শেয়াকুল খাইতে মিষ্টি,এসব তার নখ দর্পণে।”অপুর জন্ম,কৈশোর ও শৈশব নিশ্চিন্দপুরের প্রাচীন ভিটে,বাঁশ-বাগান,সোনামুখী আমের তলা,কুঠির মাঠ,কিংবা দূরের রেল-গাড়ির ঝিকঝিক শব্দে মুখরিত।খেয়ালী অপু দেখতে রাজপুত্তুরের মতন,গরীব ব্রাহ্মণের ঘরের প্রদীপ,মায়ের শান্ত ছেলে কিংবা দিদি দুর্গার আদরের খেলার সাথী।কল্পনা বিলাসী অপু কখনো রামায়ণ-মহাভারতের যোদ্ধা,কখনো বা ব্যস্ত উঠোন জুড়ে টেলিগ্রাফের তার সাজাতে।সেই অপুই আবার কাশীতে যেয়ে দেখতে পায় জীবনের অন্য রূপ।তখন তার মনে পড়ে দিদির কথা,গ্রামের কথা।“শোন অপু,আমায় একদিন রেলগাড়ি দেখাবি?”এই অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়েই দুর্গা চলে যায়।অপুকেও এগিয়ে যেতে হয় ভবিষ্যতের দিকে।পড়ে থাকে শাঁখারী পুকুর,বাঁশবন,ইছামতি নদী,পোড়ো ভিটার মিষ্টি লেবু ফুলের গন্ধ। নতুন আশা নিয়ে কাশীতে যাওয়া সর্বজয়া ও হরিহর এর গুছিয়ে ওঠা হয় না আর।কথক হরিহরকে ইহজীবনের ইতি টানতে হয় কাশীতেই।অপু আর তার মায়ের জীবনে আসে প্রকৃত আশ্রয়হীনতার সময়।দারিদ্র্যতার মাঝে বেড়ে উঠলেও তার থাবার নিচে পড়তে হয়নি এই স্বপ্নচারী বালককে এর আগে।জীবনপটে আঁকা প্রতিটি চরিত্র যেন পাঠকের সামনে দিব্যি হেঁটে-চলে বেড়ায়,চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুনো-ঝোপ কিংবা বিকেলের রোদ পড়া শ্যাওলা-পাঁচিলের দৃশ্য;এতটাই সুনিপুণ এই উপন্যাসের লেখনী।অপু-দুর্গা হয়ে উঠেছে দুরন্ত কৈশোরের প্রাণোচ্ছ্বল প্রতিনিধি।দুর্গা নিশ্চিন্দপুরের মায়ায় ডুবে গেলেও, অপুর পথের ঊষার উদয় হয়েছে জীবনের নতুন পথে।সে বিচিত্র পথের সন্ধান পেতে পাঠককে এই বইয়ের পাতাতে মুখ ডুবাতেই হবে। পৃথিবী বইয়ের হোক,বই পাঠকের হোক। রিভিউদাতা:মারজানা আফরিন বাঁধন"

Adnan Rafin

Adnan Rafin , Aug 11, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নাম:পথের পাঁচালী লেখক:বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রিভিউ লিখেছেন:আদনান রাফিন বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,বাংলার সাধারণ মানুষের সহজ-সরল জীবনের অসাধারণ আলেখ্য নির্মাণ করে বাংলা কথাসাহিত্যে যেকজন লেখক অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম।বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বনগ্রাম মহাকুমার মুরারিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনের অভিন্ন সম্পর্কের চিরায়ত তাৎপর্যে তার কথাসাহিত্য মহিমান্বিত। 'পথের পাঁচালী' বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা অন্যতম সেরা কালজয়ী উপন্যাস।সাহিত্যমূল্য বিচারে এটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ রচনা তো বটেই,বাংলা সাহিত্যেরই অন্যতম সেরা উপন্যাস।এ উপন্যাসটি গ্রামীণ জীবনের প্রকৃতিঘনিষ্ঠ দুই ভাই-বোনের আনন্দিত জীবনের আখ্যান নিয়ে রচিত হয়েছে। কিন্তু উপন্যাসটি ভাই-বোনের চিরায়ত সম্পর্কের মধ্যেই থেমে থাকেনি। 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসটি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। ক.বল্লালী-বালাই খ.আম-আঁটির ভেঁপু গ.অক্রূর সংবাদ উপন্যাসের প্রথমভাগে দেখা যায় একজন বিধবা নারীর জীবনের শেষ ভাগের সামাজিক পরিস্থিতি তথা তৎকালীন সমাজের নারীদের দুর্দশা।যেখানে ইন্দির ঠাকুরুন চরিত্রের মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে সেইসব অসহায় নারীর শেষ জীবনের অসহায়ত্বের গল্প। উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগ তথা 'আম-আঁটির ভেঁপু' এ অংশটিই উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয়।যেখানে অপু ও দুর্গা দুই ভাইবোন।যারা হতদরিদ্র পরিবারের বেড়ে উঠেছে।কিন্তু এই দারিদ্রতা তাদের শৈশবে প্রধান হয়ে ওঠেনি।বরং খোলামেলা গ্রামীণ-জীবন,সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলা,বর্ষার দিনে আম কুড়ানো এবং বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে তাদের কৌতুহল যেন মানুষের চিরায়ত শৈশবকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।এ অংশে অপু-দুর্গার জীবনের আনন্দময় সব স্মৃতি ছাড়াও প্রাপ্তি-বঞ্চনা সকল অনুভূতিরই দেখা পাওয়া যায়।অপু-দুর্গার বাবা 'হরিহর' চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে তৎকালীন শিক্ষিত সমাজের দৈন্যদশা।আর সর্বজয়া তো পল্লি-মায়ের শাশ্বত চরিত্র হয়ে উঠেছে! এই উপন্যাসের তৃতীয় অংশ অর্থাৎ 'অক্রূর সংবাদ' অংশের মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্যের চিত্র সুচারুরূপে চিত্রিত হয়েছে।যেখানে আর্থিক দৈন্যদশার কারণে হরিহর ও তার পরিবারকে ছেড়ে যেতে হয় অপু-দুর্গার ছোট্ট জীবনের আনন্দময় স্মৃতির আঁতুড়ঘর নিশ্চিন্দিপুরকে!একটুখানি আর্থিক স্বচ্ছতার লোভে স্মৃতিবিজড়িত নিশ্চিন্দিপুর ছাড়ার পরও কি হরিহরের পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছিল?কিংবা কি হয়েছিল তাদের পরিণতি-তা জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'। এ পর্যায়ে মনে হতে পারে,তাহলে তো উপন্যাসটি আমাদের গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবনের সাধারণ আখ্যান ছাড়া কিছুই নয়!আসলেই তাই।আকর্ষণীয় কিংবা অবাক করে দেওয়ার মতো কোনো গল্প নাই-একথা সত্য তবে রয়েছে আমাদের খুবই পরিচিত এই সমাজ এবং মানুষগুলোর সূক্ষ্ম ও অনুপুঙ্খ বর্ণনা।এক্ষেত্রে লেখক কোন কৃত্রিমতার আশ্রয় নেননি।বরং প্রতিটি চরিত্রের কাজের পাশাপাশি তার চিন্তা ও কল্পনার অভূতপূর্ব এক মিশ্রণ রয়েছে এ উপন্যাসে।সোনাডাঙ্গা মাঠ,আম কুড়ানো, শকুনের ডিম সংগ্রহ,বনভোজন কিংবা অপুর কল্পনার জগৎ প্রভৃতির মাধ্যমে লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেন আমাদের শৈশবের স্মৃতিগুলোরই পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন।এ সবই যেন আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমার সেই শৈশবের গ্রামীণ জীবনে।কাকতালীয় হলেও সত্য,আমি গ্রামে বেড়ে উঠলেও বর্তমানে বাস করি শহরে।এ কারণে উপন্যাসের অনেক অংশ আমার জীবনের সাথে কিছুটা হলেও মিলে যায়। এছাড়া এ উপন্যাসে রয়েছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য,তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় কুসংস্কার সহ আরও অনেক কিছুই।বস্তুত,এই উপন্যাসটি আদি ও বর্তমান সমাজের সামাজিক রীতিনীতি ও কুসংস্কারেরই প্রতিচ্ছবি।বলা বাহুল্য,এই সামাজিক বৈষম্য আজকের একাবিংশ শতাব্দীর উন্নত সমাজেও পরিলক্ষিত হয়।আর এখানেই লেখকের সার্থকতা ফুটে উঠেছে। পরিশেষে বলব,বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অপুর দৃষ্টিতে শৈশব-স্মৃতির যে চিত্র অঙ্কন করেছেন, তা প্রতিটি মানুষকেই তার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য।প্রতিটি সাহিত্যপ্রেমী মানুষ অবশ্যই এই উপন্যাসটি একবার পড়ে দেখতে পারেন।"

Arpita Mondal

Arpita Mondal , Aug 9, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"বই : পথের পাঁচালি লেখক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশনী : প্রিয়মুখ রিভিউ করছি : অর্পিতা মন্ডল #priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 নামকরণের সার্থকতাঃ মানুষের জীবনকে সর্বদা পথের ভিতর দিয়ে চলতে হয়। কারও পথ মসৃণ, আবার কারও পথ অতি বন্ধুর। পথের পাঁচালি বইটি গ্রামের এক সাধারণ পরিবারকে অতি অসাধারণ করে ফুটিয়ে তুলেছে। যা পড়তে পড়তে বুক আসে ভড়ে, হঠাৎ হঠাৎ খেয়াল হয় দুচোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছে। কাশ বোন, রেলগাড়ি, সবকিছু কি অনুভূতিপূর্ণ! তাই পথের পাঁচালি নামটি সত্যিকার অর্থেই গ্রামীণ সাধারণ একটি পরিবারের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা বইয়ের নাম হিসেবে যথার্থ। বর্ণনাঃ নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের উত্তরপ্রান্তের হরিহর রায়ের ক্ষুদ্র কোঠাবাড়ি ও হরিহর রায়ের আর্থিক অবস্থা নিয়ে শুরু হয় পাঠকনন্দিত উপন্যাস পথের পাঁচালী। প্রথম অংশটুকু পড়েই অক্ষিকোটরে এক সাধারণ গৃহস্থের ও এক ক্ষুদ্র বাড়ির ছবি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে ভেসে ওঠে। এখানেই বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর সবচাইতে বড় সফলতা, তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার লেখনীতে ফুটিয়ে তোলা কথাগুলোকে পাঠকের হৃদয়েও ফুটিয়ে তোলে, ফলে যেকোন পাঠক তাতে বিমোহিত হতে বাধ্য হয়। বৃদ্ধা ইন্দির ঠাকরুন যখন জলখাবারে চালভাজার সামান্য গুঁড়াই গোগ্রাসে খেয়ে ফেলে আর পাশে বসে থাকা দুর্গা করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে তখন দারিদ্র্যের কষাঘাত এতই নিদারুনভাবে পাঠকমন স্পর্শ করে যে তা মাঘ মাসের হাড়কাঁপানো শীতল বাতাসের ফলে সৃষ্ট হওয়া শারীরিক কষ্টকেও হয়তো হাড় মানিয়ে দিয়ে তারচেয়েও গভীর মানসিক কষ্ট দিয়ে যাবে। যেদিন রাতে দুর্গার ছোট ভাই পৃথিবীর মুখ দেখল আর দুর্গা তার ভাইয়ের কান্নার আওয়াজকে বিড়াল ছানার ডাক মনে করে ঘুমিয়ে পড়ল তখন, যেকোন পাঠক নিজের ভিতর এক ধরনের মিষ্ট অনুভূতি বোধ করবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দুর্গা যখন একটি টুকটুকে অসম্ভব রকমের ছোট্ট, প্রায় একটা কাচের বড় পুতুলের চেয়ে কিছু বড় জীবকে তার মায়ের পাশে শুয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারল সেটি তার ভাই এবং হঠাৎই অসহায়, অসম্ভব রকমের ছোট্ট নিতান্ত ক্ষুদে ভাইটির জন্য দুঃখে, মমতায়, সহানুভূতিতে মন পরিপূর্ণ করল তখন শুধু সে একাই নয় এই বইয়ের শত শত পাঠকের মনও একই রকম অনুভূতিতে উতলে উঠে। সেই ছোট বালকটিকে কেন্দ্র করে হরিহরের নির্জন বাড়িটি আবার মুখর হয়ে ওঠে। মধ্যাহ্নের দুপুরে তার ছোট ছেলেটির তারস্বরে জে_জে_জে_ শব্দে চিৎকার করে যখন উঠোনে বসে থাকা ক্লান্ত নিরীহ চড়ুইটিকে দেখায় তখন হঠাৎই একরাশ মমতা হরিহরের বুকে আঘাত হানে,সাথে আঘাত হানে পাঠক হৃদয়ে। হয়তো দু_একজন আবেগী পাঠককে খুঁজে দেখলে দেখা যাবে সুখের দুই এক ফোটা অশ্রু তাদের নয়নে সিক্ত হয়ে আছে সেই অংশ পড়ে। ইন্দির ঠাকরুন যখন হরি হরের স্ত্রী সর্বজয়া তাড়িয়ে দেওয়ার পর দুপুরের তপ্ত রৌদ্দুরে পথ শ্রান্তি ও বয়সের ভাড়ে পথ মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন, সর্বজয়ার প্রতি এক ধরনের প্রবল আক্রোশ আমি অনুভব করি। জানিনা এখানে অন্য পাঠকদের মনোভাব ঠিক কি ছিল! ইন্দির ঠাকুরন যখন করুন ভাবে মারা গেল তখন বেদনা অত্যন্ত নির্দয় ভাবে আমার মস্তিষ্ক অধিকার করে বসল, বাঁধা দেওয়ার শক্তিটুকুও দিল না!! আবার মাতৃরূপী সর্বজয়াকে দেখে পরবর্তীতে সে রাগ নিজের অগোচরেই পড়ে যায়! দুর্গা আর অপু যখন বনের ভিতর খাওয়ার অযোগ্য আশ্শ্যাওড়ার ফলকে খাদ্য হিসেবে উদ্ভাবন করে, তখন প্রকৃতি মাতাকে এক নতুন রুপে আমার আবিষ্কার করতে হয়! লেখক যেখানে লিখেছেন" বিশ্বের অনন্ত সম্পদের মধ্যে তুচ্ছ বনগাছ হইতে মিষ্টরস আহরণরত এইসব লুব্ধ দরিদ্রঘরের বালক-বালিকাদের জন্য তাই করুণাময়ী বনদেবীরা বনের তুচ্ছ ফুলফল মিষ্টি মধুতে ভরাইয়া রাখেন" সেখানটুকু পরলে আমার বোধ হয়, লেখক যেন বনদেবীর দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখা সত্যকে পরম মমতায় পাঠকের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন! সে এক অবাক বিস্ময় ও মমতানুভূতি!! দুর্গা যখন মারা যায় ম্যালেরিয়ার সাথে লড়াই করে তখন বাধ ভাঙা অশ্রু ফেলেছি আমি। কি নিদারুণ নিষ্ঠুর ভাবে পৃথিবীর সাথে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে হলো তাকে! এখানেই দারিদ্র্যতা, সামাজিক সমস্যা, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক হিনমন্যতা প্রখর ভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। সামান্য একটু ভালো ভাব বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের জন্ম স্থান, নিজের অতি পরিচিত গ্রামকে বিদায় জানাতে হয় অপুকে। বেঁচে থাকার জন্য দারিদ্র্যতা মানুষকে যেমন মহান করেছে, তেমনি অভিশপ্তও করেছে!! তাই তো নিদারুণ ব্যাথা বুকে চেপে জন্মস্থানকেও ত্যাগ করতে হয়! সেখানে গিয়ে ভালো থাকতে শুরু করলেও সুখ যে এক অসীম আশ্চর্যজনক বস্তু। সবার কাছে তা ধরা দেয় না। তাদের কাছেও হয়তো সুখ নামক বস্তুটি ধরা দিতে চায়নি। কিছুদিন পরই হঠাৎ এক অসুখে হরিহর মারা যায়। জীবন সংগ্রামে নেমে পড়তে হয় সর্বজয়াকে। এক বিশাল বিত্তশালী পরিবারে কাজের লোকের কাজ নেয় সে। সেখানে প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হয় সে। অপুর নতুন- সহজ-সরল মনে তা গভীর আঁচড় ফেলে। সে তার জন্মস্থান নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে যেতে চায়, কিন্তু কোন এক বাঁধা তাকে অদৃশ্য ভাবে বেঁধে রাখে। হয়তো প্রকৃতিই তাকে ঘরছাড়া করতে চেয়েছে! ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে তার পথ, তার পথের পাঁচালী। ব্যাক্তিগত রেটিংঃ বাংলা সাহিত্যের সেরা বইগুলর মধ্যে পথের পাঁচালি নিজের স্থান করে নিয়েছে স্বমহিমায়। বইটি পড়ে সকল পাঠকই আমার মতো তৃপ্ত হয়েছে বলেই তা সম্ভব। অবশ্যই ১০/১০। _______ . ______"

Muhammad Tamimul Ihsan

Muhammad Tamimul Ihsan , Aug 9, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book.. _club_review_2021 || Book Review || ■ Reviewer : A'bdullah U'mar ▪︎ বইয়ের নাম : পথের পাঁচালী ▪︎ লেখক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ▪︎ বইয়ের ধরণ : উপন্যাস ▪︎ প্রকাশক : প্রিয়মুখ প্রকাশনী ▪︎ প্রচ্ছদমূল্য : ২৯০/- ■ ❝পথের পাঁচালী❞ বইটির পুরো পথই যেন নিসর্গ-প্রকৃতি পরিবেষ্টিত এবং মানব-সংশ্লিষ্ট । প্রকৃতি সাহিত্যের একটি প্রধান উপাদান হয়েছে বিশ্ব জুড়েই। ভিনদেশী উদাহরণ না দিয়েও বলা যায়, প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে, কেবল যদি সংস্কৃতকেই ধরি তবুও, প্রকৃতি এর একটি বিরাট অংশ জুড়ে আছে। কেন, ক্ষুদ্রাবয়বের সেই মেঘদূত? প্রকৃতির অন্যান্য অনুষঙ্গের কথা না-ই ধরলাম, শুধু মেঘকে বাদ দিলে মেঘদূতে কিছু থাকে? ওটা নামে মেঘ, আসল তা মেঘাকৃতি বিশিষ্ট জীবনের স্পন্দন— একটি সচল ও সজীব চরিত্র। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসেই প্রকৃতিকে অবলম্বন করেছেন দৃঢ়ভাবে,নির্মাণ করেছেন যেন পুরো একটি সত্ত্বাকে। ❝পথের পাঁচালী❞ বইটি তাঁর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। একবিংশ শতাব্দীর এই যুগ সংকটের দিনে প্রকৃতি-প্রীতিতেই তিনি সর্বাধিক মনন ও মেধা ব্যয় করলেন তার কালজয়ী উপন্যাসগুলো লিখে। উপন্যাসটির আপাদমস্তক যে বাক্যগুলো চয়ন করা হয়েছে তা প্রকৃতিজাত। প্রকৃতি এর চরিত্রের সঙ্গে যেমন মিশে গেছে, তেমনি উপন্যাসের ভাব-ভাষা-প্রতীক ইত্যাদি প্রকৃতির অনিন্দ্য পরশে হয়েছে ছন্দিত। এই প্রকৃতি সমস্ত উপন্যাসটিতে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র। ■ ❝পথের পাঁচালী❞ বইটি মূলত বাংলার গ্রামে দুই ভাইবোন অপু আর দুর্গার বেড়ে ওঠা নিয়ে একটি উপন্যাস। যেখানে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে প্রকৃতির ভাব। এই উপন্যাসের ছোটদের জন্য সংস্করনটির নাম হচ্ছে “আম আঁটির ভেঁপু”। যে অংশটুকু ছোটবেলায় পড়ার সময় কেঁদেছিলাম অপুর বোন দূর্গার বিরহে। পরবর্তী কালে এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করেই বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন পথের পাঁচালী সিনেমাটি। যা দর্শকদের কাছে ব্যাপক রকমের সাড়া পায়। ■ সংক্ষেপে লেখক পরিচিতি : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। যিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার মুরাতিপুর গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে। বিশ্ববিখ্যাত এই লেখক বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন তাঁর অমর সৃষ্টি। যেগুলো তাঁকে তুলে ধরেছে বিশ্বদরবারে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস হলো__ ইছামতী, পথের পাঁচালী, আদর্শ হিন্দু হোটেল, চাঁদের পাহাড়, আরণ্যক, দেবযান হীরা মানিক জ্বলে ইত্যাদি। তন্মধ্যে আমার পড়া শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মাঝে একটি হলো এই ❝পথের পাঁচালী❞। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব দিনলিপি "তৃণাঙ্কুর" থেকে জানা যায় যে উপন্যাসটি রচনার আগে তিনি অন্তত পাঁচ বছর ধরে ভেবেছেন। আর তারই ফসল এই বক্ষমান বইটি। ■ সমগ্র উপন্যাসটি তিনটি খণ্ড ও মোট পঁয়ত্রিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত করা হয়েছে। খণ্ড তিনটি যথাক্রমে বল্লালী বালাই (পরিচ্ছেদ ১-৬; ইন্দির ঠাকরূনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে), আম-আঁটির ভেঁপু (পরিচ্ছেদ ৭-২৯; অপু-দুর্গার একসাথে বেড়ে ওঠা, চঞ্চল শৈশব, দুর্গার মৃত্যু, অপুর সপরিবারে কাশীযাত্রা চিত্রিত হয়েছে) এবং অক্রূর সংবাদ (পরিচ্ছেদ ৩০-৩৫; অপুদের কাশীজীবন, হরিহরের মৃত্যু, সর্বজয়ার কাজের জন্য কাশীত্যাগ এবং পরিশেষে নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে আসার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে)। ■ কাহিনী সংক্ষেপ : হরিহর রায়,খুব ভাল ব্রাহ্মণ নন তিনি। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে থাকেন। ইন্দির ঠাকুরন, একজন বৃদ্ধা বিধবা মহিলা, যার দেখাশোনা করার জন্য কেউ ছিল না। তিনি হরিহরের বাড়িতে আশ্রয় নেয়, যে তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। কিন্তু হরিহরের স্ত্রী সর্বজয়া, একজন খারাপ মেজাজের মহিলা, তিনি বৃদ্ধাকে দেখতে পারেন না। তাই বৃদ্ধাকে বসবাসের জন্য একটি কুঁড়েঘর দেওয়া হয়। তবে, সর্বজয়ার ছয় বছরের মেয়ে দুর্গা, ইন্দিরা ঠাকুরকে খুব ভালবাসে এবং রূপকথার গল্প শোনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সাথে বসে থাকে। কিছুদিন পর সর্বজয়ার একটি পুত্র হয়। সর্বজয়া, ইন্দিরা ঠাকুরনকে হিংসা করতে থাকে কারণ তিনি মনে করেন যে,দুর্গা তার মায়ের চেয়ে বৃদ্ধাকেই বেশি ভালবাসে। তাই ইন্দিরা ঠাকুরনকে সামান্য কারণে নির্মমভাবে কুঁড়েঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। অসহায় বৃদ্ধা তার মৃত্যুর মুহূর্তে আশ্রয়ের জন্য অনুরোধ করে, কিন্তু সর্বজয়া হৃদয়হীনভাবে না করে এবং বৃদ্ধা চালের গুদামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। চার-পাঁচ বছর পর, ছেলে অপু প্রকৃতির সৌন্দর্য ও রহস্যের প্রতি অত্যন্ত কৌতূহলী এবং সংবেদনশীল হতে থাকে। সে এবং তার বোন দুর্গা সর্বদা নতুন কিছু দু:সাহসিক কাজের জন্য বাইরে ঘুরতে বের হতে থাকে, যেমন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো, আদিবাসী খেলায় অংশগ্রহণ এবং গোপনে ফুল ও ফল পাড়া। অপু গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হয়, যেখানে গ্রামের অনেক প্রবীণ জড়ো হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে সময় কাটাত। অপুকে একদিন তার বাবা এক মক্কেলের বাড়িতে নিয়ে যায়। অপু এই প্রথম বাইরের জগতের ঝলক দেখতে পায় যা তার মনকে আনন্দ ও উত্তেজনায় ভরিয়ে তোলে। গ্রাম্য উৎসব, মেলা, এবং যাত্রা ইত্যাদি গ্রাম্য জীবনের একচেটিয়া প্রবাহে বৈচিত্র্য এবং রোমাঞ্চ নিয়ে আসে। দুর্গা, অস্থির কিন্তু অতি নির্দোষ এক মেয়ে, হঠাৎ করে মারা যায়, যা পুরো পরিবারকে শোকে ডুবিয়ে দেয় এবং তার ছোট ভাইকে একা করে দেয়। হরিহর দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে যায় ও জীবিকা অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে সংগ্রাম করতে থাকে। বাড়ি ফেরার পর হরিহর নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা সব গোছগাছ করে রেলওয়ে স্টেশনে যায়। ট্রেন চাড়লে, নিশ্চিন্দিপুরের যাওয়া জন্য তারা ট্রেনে উঠে ও পিছনে চিরকালের মত তাঁদের সুখ-দুঃখের স্মৃতি রেখে যায়। এরপর কাশি গিয়ে উঠলেও সুখ জোটেনি কপালে আর,কিছুদিন ভালো মতো টেনেটুনে পুজো দিয়ে চললেও হঠাৎ করে মারা যায় অপুর বাবা। মোড় ঘুরে যায় অপুর জীবনের। এরপর জীবনের টানে কাশি ছেড়ে অপুর মা কাজ করতে পাড়ি জমায় এক জমিদার বড়লোক বাড়িতে। সেখানে জীবনটা যেনো দুঃসহ হয়ে ওঠে অপুর। কোনো কিছুই যেনো নিজের মতো করে করতে পারে না সে। এর বকুনি,ওর ঝাঁটার বারি যেন তার পিছনে লেগেই থাকে। অবশেষে অত্যাচারের অতিষ্ঠ হয়ে ছেলে অপুকে নিয়ে নিশ্চিন্দিপুরের পথে রওয়ানা হয় অপুর মা। কিন্তু সে তাঁর সঠিক পথ খুঁজে পায় না। কিন্তু বলাই বাহুল্য যে এই সামাজিক বৈষম্য আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এই উন্নত সমাজেও পরিলক্ষিত হয়। বস্তুত এই উপন্যাস আদি ও বর্তমান সামাজিক উত্থান-পতন ও সামাজিক কুসংস্কারেরই প্রতিচ্ছবি। ■ বইটি কেন পড়বেন : 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন এর থেকে শিক্ষা কিছুই হয়নি, দেখা হয়েছে অনেক- যা পূর্বে এমন করে দেখিনি'। বাস্তবেই আপনি পথের পাঁচালী একবার পড়লে আপনার তৃষ্ণা মিটবে না। পড়তে হবে বেশ কয়েকবার। আর পথের পাঁচালী এই উপন্যাসটির পটভূমি হচ্ছে গ্রামবাংলার প্রকৃতি। বইটিকে পড়াকালীন নিজেকে এই কোলাহলযুক্ত শহরের বাসিন্দা এই চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে নিজেকে গ্রামের সেই সুদূর কোণের অজপাড়াগাঁয়ের একটা ছেলে ভাবুন দেখবেন কতটা খুব সময়ের মধ্যেই আপনি হারিয়ে যাবেন সেই সুদূর গহীনে। একের পর এক কাহিনী আপনাকে বইটি শেষ পর্যন্ত শেষ করতে বাধ্য করবে। ■ ব্যক্তিগত মতামত : ব্যক্তিগতভাবে বইটা শেষ করেছিলাম মাত্র দুইদিনে। এত অসাধারণ উপন্যাস আমার জীবনে কম সময়েই পড়া হয়েছে। পড়ার পর বলেছিলাম,আমাকে যদি কাউকে সাহিত্যে নোবেল দিতে বলা হয় নির্দ্বিধায় তা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দিতাম। ■ কিছু প্রিয় উক্তি : ▪︎ "করুণা ভালবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মসলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা হয়।" ▪︎ 'জীবন বড় মধুময় শুধু এইজন্য যে, এই মাধুর্যের অনেকটাই স্বপ্ন ও কল্পনা দিয়া গড়া। হোক না স্বপ্ন মিথ্যা, কল্পনা বাস্তবতার লেশশূন্য; নাই বা থাকিল সবসময় তাহাদের পিছনে স্বার্থকতা; তাহারাই যে জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তাহারা আসুক, জীবনে অক্ষয় হোক তাহাদের আসন; তুচ্ছ স্বার্থকতা, তুচ্ছ লাভ।" ▪︎ 'আমি চাই নি দিদি, আমি তোকে ভুলি নি, ইচ্ছে করে ফেলেও আসি নি__ওরা আমায় নিয়ে যাচ্চে।" ■ শেষকথা : শেষ করি অধ্যাপক সৌমিত্র শেখরের কথায়, “ড. সৌমিত্র শেখর” উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ❝ বিভূতিভূষণ দরিদ্র চরিত্রগুলোর সমাবেশ ঘটিয়ে কোন দুঃখগাঁথা তৈরি করতে চাননি। অথবা চান নি প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি বিপ্লব ঘটাতে। তিনি যুগের অস্থিরতায় না জড়িয়ে আবহমানকালের চিরস্থায়ী, চিরসাক্ষী এবং একটি পরিপূর্ণ সত্তা নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলম্বন করলেন এ উপন্যাসে।❞ ■ ব্যক্তিগত রেটিং : 5/5 ( নিয়ম থাকলে 10/5 দিতাম)"

Ni Han

Ni Han , Aug 8, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নামঃ পথের পাঁচালী লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশনীঃ প্রিয়মুখ রিভিউকারী : Ahmed Hridoy দিবারাত যত পলক পেরোয়, নিত্য মহাপ্রলয়-বাহার। রঙ্গমঞ্চে লাগাম অবিদিত দূর্বার, ভাঙা-গড়ার আধার। "পথের পাঁচালী" জীবনের চলমানতা, উত্থান-পতন ও বাস্তবতার নির্মম মেলবন্ধন নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের জীবন, জীবনমেলায় তাদের অল্পবিস্তর আনন্দের বিচিত্রপসরা, জীবনযুদ্ধে শূণ্যহাতে দারিদ্র্যের করাল আঘাতে বারংবার হেরে গিয়েও সব ফিরে পাবার আশায় বুক বেধে আবারো সর্বস্বান্ত হওয়া, তবু জীবন-তরী আঁকড়ে বাঁচার গল্পই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের হরিহর রায় ও তার পরিবারকে নিয়ে লেখা উপন্যাসটিকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। উপন্যাসের প্রথম ভাগঃ বল্লালী বালাই। রাজা বল্লাল সেনের সময়ে কৌলিন পুরুষদের বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। কৌলিন পুরুষেরা বিবাহের পর স্ত্রীকে তার বাবার বাড়ি ফেলে রেখে যেত। কৌলিন্য ধারাপাতের শিকার হরিহরের দূরসম্পর্কীয় দিদি ইন্দির ঠাকরুনের অসহায় জীবনকথা বর্ণিত হয়েছে এই ভাগে। অল্প বয়সে বিবাহের পরপর হরিহর কাশী চলে যান এবং দীর্ঘসময় পর গ্রামে ফিরে এসে সংসারজীবন শুরু করেন। সেই সংসারে স্ত্রী সর্বজয়া, ছয় বছরের একটি মেয়ে ও সদ্যবাড়ন্ত ছোট ছেলেটি ছাড়াও আরেকজন অনাকাঙ্ক্ষিত সদস্য থাকেন। তিনি হরিহরের দূরসম্পর্কের মামাতো বোন, ইন্দির ঠাকরুন। বাবা-মা এবং একমাত্র কন্যা হারানো ৭০ বছরের নিঃস্ব, নিরাশ্রয়া বৃদ্ধা, ইন্দির ঠাকরুন। হরিহরের ছোট মেয়েটির সাথে ইন্দির ঠাকরুনের এক মমতাময়ী সম্পর্ক। খুকির মাঝে নিজের মৃত মেয়েকে খুঁজে পান ইন্দির ঠাকরুন। খুকিকে গল্প শোনানো, ছড়া শেখানো তার নিত্যদিনের কর্ম তালিকার স্থায়ী বস্তু। কিন্তু অভাব-অনটনের সংসারে সর্বজয়া ইন্দির ঠাকরুনকে উটকো ঝামেলা মনে করে, উঠতে বসতে নানারূপ খোঁটা দেয়। অপমানে আহত ইন্দির ঠাকরুন প্রায়ই বাড়িছেড়ে চলে যায়। একটুখানি খাবার ও আশ্রয়ের আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে। কিন্তু আশ্রয়ের অভাবে আবারও নতমুখে ফিরে আসে লাঞ্চনা সইতে। অবশেষে একদিন লাঞ্চন-সীমার সমাপ্তি ঘটে। রোগাশীর্ণ শ্বাস থেমে যায় ইন্দির ঠাকরুনের। জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয়হীনতার কাতর গল্পগুলো। উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগঃ আম-আঁটির ভেঁপু। আমের আঁটি দিয়ে বানানো ভেঁপুর দুই অংশের মতো স্নেহ-মমতা কিংবা খুনশুটি-চঞ্চলতার দু'পিঠ- অপু ও দুর্গা। এই ভাগে গ্রামীণ মুক্ত পরিবেশে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও অবারিত আনন্দখেলায় আহারে-অর্ধাহারে অপু-দুর্গার বেড়ে ওঠার গল্প বর্ণিত হয়েছে। দুর্গার রুক্ষ চুল এলোবাতাসে উড়িয়ে সারাগ্রাম হইহই রইরই করা চঞ্চলতা, বনে-বাদাড়ে ঘুরে নানাবিধ ফলফলাদি সংগ্রহ করে অপুকে নিয়ে মহানন্দে খাওয়া, বাড়ির সামনে মিছেমিছি দোকান সাজিয়ে খদ্দের-দোকানি সেজে খেলা, মাকে ফাঁকি দিয়ে ভরদুপুরে বাইরে থাকা, চড়ুইভাতি করা- এসবই যেন তাদের অফুরন্ত আনন্দের জগৎভাণ্ডার। অপু-দুর্গার মাধ্যমে লেখক যেন আমাদেরই শৈশব-গল্পগুলোকে এক সুতোয় বেধে দিয়েছেন। তাদের গ্রাম্য জীবন, চঞ্চল-অবাধ বিচরণ যেন আমাদেরই শৈশব-খুনশুটির প্রতিচ্ছবি, ভালোবাসার চিরায়ত বন্ধন। লেখক খুব দক্ষতার সাথে এই খুনশুটির মাঝেই দৈনন্দিন ঘটনায় ফুটিয়ে তুলেছেন এক নিম্নবিত্ত পরিবারকে। যেখানে অভাব-অনটন সর্বদা লেগেই থাকে। তাদের মা সর্বজয়া যেন শ্বাশ্বতকালীন দরিদ্র বাঙালি মায়ের মূর্তরূপ যে তার সন্তানদের অন্ন-বস্ত্রের যোগান ঠিকমতো দিতে না পেরে সর্বদাই ব্যথিত থাকে। একসময় দরিদ্রতা তীব্ররূপ ধারণ করে। হরিহরের বাড়িতে চিঠিপত্র ও টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। ম্যালেরিয়ায় ভুগতে থাকে দুর্গা। অবশেষে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির পর রৌদ্রালোকিত কোনো ক্ষণে রেলগাড়ি দেখতে চাওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে বহুদূরের ঠিকানাহীন পথে পাড়ি জমায় অশান্ত, চঞ্চল, পাড়াবেড়ানি মেয়েটি। দুর্গার মৃত্যুর পর স্ত্রীপুত্রকে নিয়ে হরিহরের কাশীযাত্রার মাধ্যমে দ্বিতীয় ভাগের সমাপ্তি ঘটে। উপন্যাসের তৃতীয় ভাগঃ অক্রুর সংবাদ। মহাভারতে অক্রুর সাথে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন বিদায়কে বলা হয় অক্রুর সংবাদ। হরিহরের সাথে অপুর নিশ্চিন্দিপুর বিদায়ের সমার্থকতায় এইভাগের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। এই ভাগে বাবা-মায়ের সাথে বাল্যকালের স্মৃতিবিজড়িত জায়গা নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে অপুর কাশীযাত্রা এবং জীবন-বাস্তবতার কঠিনতম মোড়ে পদার্পণ বর্ণিত হয়েছে। সুখ-সমৃদ্ধির বুকভরা স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে কাশীগমনের পর হরিহর ও তার পরিবারে নেমে আসে বিপদসংকুল কালোমেঘের দুর্ভাগ্য-আধার। ঘাটে-মন্দিরে পুরাণ পাঠের মাধ্যমে কাশীজীবন শুরুর অল্পদিন পরেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হরিহরের মৃত্যু ঘটে। পুত্র নিয়ে দিশেহারা, উপায়হীন সর্বজয়া রাধুনীর কাজে নিযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে এক ধনী পরিবারে মাথা গোঁজার ঠাই পায়। আজীবন মুক্ত হাওয়ার প্রাণোচ্ছল প্রকৃতিতে ছুটে বেড়ানো অপু এবং শূন্যহাতে অভাব জড়িয়ে রাজত্ব করা সর্বজয়া ধনীবাড়ির স্যাঁতস্যাঁতে নির্জনতায় হাঁপিয়ে ওঠে। তবু চলতে থাকে সংগ্রাম। সেই সাথে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস থেকে মুক্তির আকুল প্রার্থনা। সমাজের উঁচুশ্রেণীর ধন-সম্পদ প্রাচুর্যের বিপরীতে নিচুশ্রেণীর আছে অন্তর-প্রকৃতির মিলন-ঐশ্বর্য। কালে কালে সেই উচ্চশ্রেণীর প্রাচুর্যতলায় পিষ্ট-দলিত হয়েছে নিম্নশ্রেণীর মুক্ত-সরল প্রাণ। উপন্যাসে লেখক একইসাথে গ্রাম-প্রকৃতির চিরচেনা সৌন্দর্যের প্রগাঢ় শ্যামস্নিগ্ধতা এবং শহরজীবনের ইট-সিমেন্টে বাঁধানো খাঁচায় বন্দী পরাধীনতা দেখিয়েছেন। গ্রামজীবনের সরল অবোধ কলহাস্যগুলো যেন শহরযাত্রায় পথ হারিয়ে চিরকাল ছন্নছাড়া হয়ে ঘোরে। দরিদ্রতার উর্ধ্বে জীবিকা নির্বাহের জন্য হতদরিদ্র শ্রেণী চিরকালই খেটে মরে। তবু স্বচ্ছল জীবন তাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ধনীসমাজের ধনসম্পদ ভারের পরাধীনতায় আজীবন নুয়ে থাকে অপু-দুর্গাদের মতো হতদরিদ্র পরিবার। যুগ যুগ ধরে এভাবেই উঁচুশ্রেণীর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর বঞ্চনা-বৈষম্যের শিকার হয়েও জীবনসংগ্রামে অংশ নেয় নিচুশ্রেণী, এগিয়ে যায় সুখ-সমৃদ্ধিরূপী মরিচীকার আশায়।"

Halima Akter Tanny

Halima Akter Tanny , Aug 8, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নাম: পথের পাঁচালী লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় ধরণ: বিয়োগান্তক, পারিবারিক কাহিনি প্রথম প্রকাশ: ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২০৭ ( আমার কাছে যেটি আছে তার সংখ্যা বলেছি। প্রকাশভেদে পৃষ্ঠাসংখ্যা হেরফের হতে পারে) মুদ্রিত মূল্য: ১০০ টাকা ব্যক্তিগত রেটিং: ১০/১০ পথের বাঁকে বাঁকে, বাঁশবনে, কদমতলায়, শিমুলতলায়, বনকলমিতে, নীল অপরাজিতায়, ঘাটে, বাড়ির উঠোনে বসা হলদে পাখির ডানা ঝাঁপটানোয়,ওড়কলমিতে,লেবুগাছে, গুলঞ্চলতায় কত যে আনন্দ, বিষাদ, সংগ্রাম, পরাজয়ের কাহিনি ছড়ানো থাকে তা "পথের পাঁচালী" না পড়লে বাঙালি ততটা অনুভব করতে পারত না।আমরা যারা জ্ঞান হওয়ার পর থেকে শহরে মানুষ হয়েছি তাদের কাছে গ্রাম, গ্রামের গাছপালা, পথ-ঘাট চিরকালই অচেনা। বছরান্তে গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হলেও গ্রামের সাথে আমরা নিজেদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতে পারি না। তাই গ্রামের পরতে পরতে যে অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে তা আমাদের চোখে পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু দুইভাইবোন দুর্গা আর অপুর কাছে গ্রাম যেন তাদের অস্তিত্ব বহন করে। শত দারিদ্র্যের মাঝেও নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম, তাদের নড়বড়ে বাড়ি, বাড়ির উঠান, বাঁশঝাড় এ সবকিছুর মধ্যে, নিতান্ত সাধারণ জিনিসের মধ্যে তারা জীবনের আনন্দ খুঁজে নেয়। কাহিনিসংক্ষেপ: বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিককার কথা। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে থাকে একটি পরিবার। পরিবারের প্রধান কর্তা ব্রাহ্মণ হরিহর রায়। পূর্বপুরুষদের ডাকাতির কুখ্যাতি থাকলেও হরিহর রায় নিতান্ত ভালোমানুষ ধরণের। তবে তার উপার্জন নিতান্তই নগণ্য। লোকেদের বাড়িতে মন্ত্রপাঠ করে তেমন একটা আয় হয় না। এই পরিবারের বাকি সদস্যরা হলেন তার স্ত্রী সর্বজয়া, মেয়ে দুর্গা আর দুরসম্পর্কের এক বিধবা দিদি ইন্দির ঠাকরুন। ইন্দির ঠাকরুণের সাথে দুর্গার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। দুর্গার মধ্যে তিনি তার মৃত মেয়ে বিশ্বেশরীকে দেখতে পান। কৌলিন্য প্রথার শিকার, অল্প বয়সে বিধবা হওয়া ইন্দির ঠাকরুনের বাপ ভাই মরার পর হরিহর রায়ের বাড়িতে আশ্রয় জুটেছিল কিন্তু সেখানে প্রতিমুহূর্তে তাকে মনে করানো হত সে একজন আশ্রিতা। সর্বজয়া যেন তাকে সহ্যই করতে পারতেন না।মাঝেমাঝে অপমান হজম করতে না পেরে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন কিন্তু শেষমেশ যাওয়ার আর কোনো জায়গা না থাকায় আবার সেখানেই ফিরে আসতেন। এইভাবে একদিন বাড়ি ছেড়ে যাবার পথে তার মৃত্যু হয়। এরই মধ্যে দুর্গার একটি ভাই হয় যার নাম অপু। সুন্দর, মায়াময় চেহারার, লক্ষ্মী ছেলে অপুকে সবাই ভালো বাসত। অপু আর দুর্গার খুনসুঁটি, মারামারি, একে অপরের প্রতি গভীর মমতা এভাবেই কাহিনি এগিয়ে চলে। ছোট্ট বালক অপুর চোখে সর্বদা আশেপাশের প্রকৃতি নিয়ে অবাক বিস্ময় কাজ করে আর দুর্গার চোখে বালিকাসুলভ ইচ্ছেগুলো পূরণের আকাঙ্ক্ষা। হরিহর নিজের ভাগ্য বদলানোর জন্য বাড়ি থেকে দীর্ঘদিনের জন্য বাইরে চলে যায় এদিকে দুর্গা অসুস্থ হয়ে পড়ে। নানা বিষাদময় অধ্যায়ের পর একদিন হরিহর রায় সিদ্ধান্ত নেয় আর নিশ্চিন্দিপুর নয়, সপরিবারে কাশি চলে যাবে। এতদিনের সব স্মৃতি পেছনে ফেলে রেখে কাশির পথে যাত্রা করে অপু। দেশ-বিদেশ ভ্রমণের প্রতি উৎসাহী অপু কাশি যাওয়ার পথে নতুন নতুন সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। সে অভিজ্ঞতা মিশ্র। এভাবেই নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে কাশি যাওয়া এবং সেখানে পরবর্তীতে বিভিন্ন কাহিনির মাধ্যমে উপন্যাসটি এগিয়ে যেতে থাকে। চরিত্র পরিচিতি: অপু: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। অপুকে পূর্ণতা দেবার জন্য, তার জীবনকথা বিবৃত করার জন্যই লেখকের সকল আয়োজন। অপু যেন স্বয়ং লেখকেরই প্রতিচ্ছবি। ফর্সা, সুদর্শন অপুর চোখে প্রকৃতি নিয়ে রাজ্যের বিস্ময়। তার শিশুসুলভ কৌতূহল, মুক্তদৃষ্টি, স্বপ্নবিলাস, ভাবাচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যপিপাসু ও কল্পনাদীপ্ত মন তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। অপুর মধ্যে অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার এক তীব্র ইচ্ছে বাস করে। মায়ের জন্য, বাবার জন্য, দিদির জন্য সর্বোপরি মানুষের জন্য তার অফুরন্ত মায়া, মমতা ও ভালোবাসা রয়েছে। দুর্গা: পাতলা গড়ন, চাপা বর্ণ, ময়লা কাপড় আর রুক্ষ চুল এসব নিয়েই দুর্গা। উপন্যাসের সবচেয়ে সক্রিয় চরিত্র দুর্গা। দুর্গার মধ্যে রয়েছে দুরন্তপনা, সে আর পাঁচটা মেয়ের মত শান্ত, মায়ের বাধ্য অথবা নিজের সাজসজ্জার ব্যাপারে সর্তক মেয়ে নয়। সারাদিন বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো দুর্গার স্বভাব। কার বাগানে কি কি ফল আছে,কোন ফল পেকেছে, গভীর জঙ্গলের কোথায় কি আছে এসব দুর্গার নখদর্পনে। দুর্গার মধ্যে জেদ আছে, লোভ আছে, মুক্তির ইচ্ছে আছে। শত দারিদ্র্যের মাঝেও সদা হাস্যোজ্জ্বল দু্র্গা।সকলের মাঝে থেকেও যেন সে নিঃসঙ্গ। ছোট ভাই অপুর প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসা দেখা যায়। সর্বজয়া: আর পাঁচটা বাঙালি নিম্নবিত্ত জননী যেমন হয় সর্বজয়াও তেমনি। দুর্গা,অপুর মা সর্বজয়া উপন্যাসের একটি জীবন্ত চরিত্র। সংসারের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সে শক্ত মনের অধিকারিণী। দারিদ্র্য তার নিত্যসঙ্গী, স্বামী বর্হিমুখী, স্বল্প উপার্জনক্ষম হওয়ায় দশভুজার মত সবদিক সামলাতে হয় তার। উপন্যাসের প্রথমদিকে ইন্দির ঠাকরুণের প্রতি তার আচরণ খুবই নির্মম ছিল যেকারণে স্বাভাবিকভাবে তাকে সবার খারাপ লাগবে কিন্তু এই চরিত্রটির প্রতি ধীরে ধীরে এক ধরণের মমতা তৈরি হয়। প্রকৃতির নিষ্ঠুর পরিহাসে সব হারায় যার তার নাম "সর্বজয়া"! হরিহর: দুর্গা, অপুর বাবা উপন্যাসের প্রধান পুরুষ চরিত্র হরিহর। দারিদ্র্য তার নিত্যসঙ্গী হলেও সে কখনো হাল ছাড়ে না। স্বভাবে সে ভবঘুরে, জীবিকার টানে ও ভ্রমণের নেশায় সে প্রায়ই বাড়ি থাকে না। তার এই ভবঘুরে স্বভাবের জন্য বিয়ের পরপরই নতুন বউকে রেখে দশবছর নিরুদ্দেশ থাকে। তবে সৎ, নির্লিপ্ত হরিহর রায় অপুর জন্মের পর সংসারের দিকে মনোযোগী হয়। নিজে সামান্য লেখাপড়া জানত বলে তার ইচ্ছে ছেলেও অনেক পড়াশোনা করবে। নতুন নতুন বইয়ের প্রতি অপুর ঝোঁক তার বাবার হাত ধরেই। ইন্দির ঠাকরুন: কৌলিন্য প্রথা একসময় বাংলাদেশের হিন্দু সমাজকে ব্যাপকভাবে গ্রাস করেছিল। এই প্রথার ফলে সমাজে বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল। এর একটি উদ্দেশ্য ছিল এরকম যে, বহু স্ত্রী থাকলে বেশি পণ (যৌতুক) পাওয়া যাবে এবং পালাক্রমে শ্বশুরবাড়িতে সুলভ আপ্যায়ন উপভোগ করতে পারবে। এই প্রথার কারণে কতশত নারী যে অবজ্ঞা, অবহেলার শিকার হয়েছিল তার হিসেব নেই। ইন্দির ঠাকরুন এই নির্মম প্রথার শিকার। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে নিজস্ব কোনো আশ্রয় না থাকায় মৃত্যুর আগপর্যন্ত অপমানের শিকার হয়ে মারা যাওয়া যার পরিণতি ছিল। পাঠ প্রতিক্রিয়া: এই উপন্যাসটি ছোটোবেলায় একবার পড়েছিলাম। বুদ্ধির অপরিপক্কতার দরুণ তখন অনেককিছুই বুঝিনি৷ বড় হয়ে যখন আবার পড়লাম তখন বুঝতে পারলাম এটি একটি কালকে অতিক্রম করা উপন্যাস। উপন্যাসের কাহিনি নিতান্তই সাধারণ, তেমন চমকপ্রদ নয় এবং বর্ণনাও অনেকটা ধীর গতির কিন্তু এই উপন্যাসে লেখক একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের সাথে প্রকৃতির এমন অপরূপ চিত্রপট সাজিয়েছেন যেটা পাঠককে শেষ পর্যন্ত পড়তে বাধ্য করবে। এই উপন্যাসের আরেকটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য হলো এটি মনগড়া কোনো কাহিনি নয়, আমাদের গ্রামবাংলার বাস্তব কাহিনি। চরিত্রগুলো রহস্য, রোমাঞ্চে ভরা নয় বরং খুবই সরল এবং লেখকের নিজ পরিবার তথা কাছ থেকে দেখা মানুষগুলো থেকে অনুপ্রাণিত সেকারণেই এটি সবাইকে এতটা আকর্ষণ করে। সংলাপ অত শক্তিশালী নয় কিন্তু আপনার মনে হবে না একটুও মেকি বা অতিরঞ্জিত।জীবননানন্দকে "রূপসী বাংলার কবি" বলা হয় কিন্তু "পথের পাঁচালী" পড়ার পর আমার কোথাও যেন মনে হয়েছে বিভূতিভূষণের মত প্রকৃতির এত অপরূপ, সূক্ষ্ম বর্ণনা কেউ এ যাবত উপন্যাসে দিতে পারেননি। পড়তে পড়তে আপনার মনে হবে কোথায় সেই নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম? আমিও যেতে চাই সেখানে।প্রকৃতির দৃশ্যগুলো যেন চোখের সামনে ভাসবে। ভাইবোনের ভালোবাসা, খুনসুঁটি, অপুর বিস্ময়কর দৃষ্টিতে প্রকৃতি দেখা যেমন আনন্দ দিয়েছে তেমনি অপু, দু্র্গার ছোটো ছোটো শখ পূরণ না হওয়া, ইন্দির ঠাকরুণের পরিণতি, সর্বজয়ার সংগ্রাম, বিভিন্ন ঘটনায় অপুর চোখে জল আসা, গোকুল দ্বারা তার বউকে নিযার্তন এগুলো তেমনি মন খারাপ করে দিয়েছে। চোখে জল এনে দিয়েছে। মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়া যে কতটা প্রয়োজন তা ইন্দির ঠাকরুনের পরিণতি দ্বারা বুঝানো হয়েছে। এছাড়া এই উপন্যাসটা পড়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত উপলব্ধি হয়েছে। আমি বা আমরা যারা এত দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হইনি, সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় শৈশব থেকেই আমাদের সব শখ মোটামুটি পূরণ হয়েছে, এখনো হচ্ছে তারা জীবন নিয়ে কত অভিযোগ করে বসি। হয়ত মাঝেমাঝে অত্যন্ত দামী কোনো জিনিস তাৎক্ষণিকভাবে না পাওয়ায় মন খারাপ করি। অনেকে জেদ করি, অভিমান করি, বাবা-মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করি, যেটা আমাকরুণা ভালবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মসলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা হয়।দের করা মোটেই উচিত নয়। আমাদের আসলে কোনো ধারণা নেই পল্লীর এসব নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের জীবন নিয়ে। যে জীবন নিয়ে আমরা হতাশ, সেটা তাদের জন্য স্বপ্ন। বইটি কেন পড়া উচিত? -অন্নদাশঙ্কর রায় মন্তব্য করেছেন যে, "বাংলা উপন্যাসের সবচেয়ে ছোটো একটি তালিকা করলেও "পথের পাঁচালী" কে বাদ দেওয়া অসম্ভব। দশখানার মধ্যে একখানা তো বটেই। পাঁচখানার মধ্যে ও একখানা"। রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটা এরকম- "এই বইখানিতে পেয়েছি যথার্থ গল্পের স্বাদ। সাহিত্যে একটা নতুন জিনিস পাওয়া গেল অথচ পুরাতন পরিচিত জিনিসের মত সুস্পষ্ট।" এথেকেই বোঝা যায়, বাংলা সাহিত্য জানতে হলে বইটি পড়ার কোনো বিকল্প নেই। অনুবাদ: "পথের পাঁচালী" ১৯৬০ সালে একই নামে তেলেগু ভাষায় প্রথম অনূদিত এবং প্রকাশিত হয়। এটি অনুবাদ করেন মাদিপাতলা সুরি। পরবর্তীতে এটি চিন্থা লক্ষ্মী সিংহরাচি কর্তৃক 'মাওয়াতে গীতা' নামে সিংহলী ভাষায় অনূদিত হয় এবং ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। এটি শ্রীলঙ্কায় অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় এবং একই অনুবাদক অপু ত্রয়ীর অন্য দুটি বইয়ের অনুবাদও সম্পন্ন করেন। এছাড়া এটি ২০০৯ সালে মালয়ালাম এবং ১৯৬৮ সালে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস কর্তৃক ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। ২০১৩ সালে উপন্যাসটির একটি অভিযোজন বিবিসি রেডিও ৪-এ একটি "ধ্রুপদী ধারাবাহিক" হিসাবে সম্প্রচার করা হয়। চলচ্চিত্রায়ণ: ১৯৫৫ সালে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় উপন্যাসটির উপর ভিত্তি করে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন যা পরবর্তীতে বিশ্ববিখ্যাত হয়। প্রিয় কিছু উক্তি: 📖"মা ছেলেকে স্নেহ দিয়া মানুষ করিয়া তোলে, যুগে যুগে মায়ের গৌরবগাথা তাই সকল জনমনের বার্তায় ব্যক্ত। কিন্তু শিশু যা মাকে দেয়, তাই কি কম? সে নিঃস্ব আসে বটে, কিন্তু তার মন-কাড়িয়া-লওয়া হাসি, শৈশবতারল্য, চাঁদ ছানিয়াগড়া মুখ, আধ আধ আবোল-তাবোল বকুনির দাম কে দেয়? ওই তার ঐশ্বর্য, ওরই বদলে সে সেবা নেয়, রিক্ত হাতে ভিক্ষুকের মতো নেয় না।" 📖"জীবন বড় মধুময় শুধু এইজন্য যে, এই মাধুর্যের অনেকটাই স্বপ্ন ও কল্পনা দিয়া গড়া। হোক না স্বপ্ন মিথ্যা, কল্পনা বাস্তবতার লেশশূন্য; নাই বা থাকিল সবসময় তাহাদের পিছনে স্বার্থকতা; তাহারাই যে জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তাহারা আসুক, জীবনে অক্ষয় হোক তাহাদের আসন; তুচ্ছ স্বার্থকতা, তুচ্ছ লাভ।" 📖"বুড়ি সে কথা হজম করিয়া লইল। এরূপ অনেক কথাই তাহাকে দিনের মধ্যে দশবার হজম করিতে হয়। সেকালের ছড়াটা সে এখনো ভোলে নাই- লাথি ঝাঁটা পায়ের তল,ভাত কাপড়টা বুকের বল।" 📖"করুণা ভালবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মসলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা হয়।" 📖"আমি চাই নি দিদি, আমি তোকে ভুলি নি, ইচ্ছে করে ফেলেও আসি নি_ ওরা আমায় নিয়ে যাচ্চে_।""

Arafat Haq Biswass

Arafat Haq Biswass , Aug 7, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নামঃ পথের পাঁচালী লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় প্রকাশনীঃ প্রিয়মুখ রিভিউ কারিঃ আরাফাত হক বিশ্বাস ডঃ সৌমিত্র শেখর বলেছেন, “বিভূতিভূষণ দরিদ্র চরিত্রগুলোর সমাবেশ ঘটিয়ে কোন দুঃখগাঁথা তৈরি করতে চাননি। অথবা চান নি প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি বিপ্লব ঘটাতে। তিনি যুগের অস্থিরতায় না জড়িয়ে আবহমানকালের চিরস্থায়ী, চিরসাক্ষী এবং একটি পরিপূর্ণ সত্তা নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলম্বন করলেন এ উপন্যাসে।” সত্যিই তাই, জীবনানন্দের নিসর্গময় কাব্যভাষার গদ্যরূপ যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালী’। এতে কোনো কাব্যময়তা নেই, কিন্তু আছে অদ্ভূত ছন্দময়তা। যে সামাজিক প্রেক্ষাপটে গোটা উপন্যাসটি রূপায়িত, তার ব্যাপ্তি যেন কেবল প্রতি যুগের সাক্ষী শাশ্বত ঘটনাবলীতে নয়। চিরায়ত বাংলার সমস্ত রূপ রসই এই উপন্যাসের মনোমুগ্ধতার আধার। রাংচিতা, গুড়কলমী, রঙিন মাকাল ফল, ঘেঁটু, সোঁদালী, লেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধ, গ্রাম্য বধূর ভিজে পায়ের ছাপ, কাশবন, পদ্মঝিল, দুই কিশোর- কিশোরীর দুরন্তপনা, অপার বিস্ময় আর তাদের অনুসন্ধিৎসু চোখের অবাক করা নিশ্চুপ দৃষ্টি। উপন্যাসটি পড়ার সময় লেখকের বর্ণনাশৈলীর গুণে পাঠক সেই দৃষ্টিকে খুঁজে পাবেন ঠিক! সে নিশ্চুপ দৃষ্টির ভাষা যেন শব্দের চেয়েও জোরে কথা বলে! আর সেই ছবি শিল্পীর তুলিতে বিভূতিভূষণ এঁকেছেন ঠিক নির্ভুলভাবে। দূর অতীতের সাথে পল্লীবাংলার জীবনের গ্রামীণ যোগ দিয়ে শুরু হওয়া উপন্যাসটির বর্ণনা ধীর। কাহিনীতে আচমকা চমক আনায় শিল্পীর কোনো আগ্রহ ছিলো না। কিন্তু উপন্যাসের বাক্যশৈলী ও চিত্রায়নে প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রসভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিতে লেখক মনোযোগ দিয়েছেন ষোলআনা। আমাদের এই চিরায়ত বাংলার আশা-আকাঙ্ক্ষা, নৈরাশ্য-বেদনার ছবিসহ দারিদ্র্য লাঞ্চিত পল্লীগ্রামের বালক বালিকার মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ করতে লেখক ছিলেন ব্যস্ত। গৃহস্থালি, পল্লীপথ, বনবাদাড়, মাঠঘাট, আগাছা-পরগাছা ,পূজা-পার্বন প্রভৃতির ছবির সাথে ধীরে ধীরে করুণ রস নিষিক্ত করে কাহিনীর পরতে পরতে ঔপন্যাসিক সংযোজন করেছেন মানবজাতির আদি এক অনুভূতি – মায়া। যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসের চরিত্রগুলিতে, অতি সাধারণ ঘটনাপ্রবাহেই পাঠকের মনে তা সঞ্চার করে গভীর মমত্ববোধ। এই মমত্ববোধ লেখকের গভীরতা সঞ্চারী চিত্রকল্পকে আর্দ্রতায় মিশিয়ে দেয় চরিত্রগুলির সাথে। ইছামতীর তীরে নিশ্চিন্দিপুর গাঁ এর ব্রাহ্মণ রায় পরিবারের দারিদ্র্যের সংগ্রাম, গ্রামীণ সংস্কারের আড়ম্বরতা, বৃটিশদের অধীনে গ্রাম্য সমাজের দশা, বিপরীতভাবেই অবস্থাপন্ন বাড়িগুলোতে চোখ টাঁটানো জাঁকজমক- আর সবকিছু ছাপিয়ে ক্রূর হাসি হেসেছে অমোঘ অদৃষ্ট। এরই মাঝে সপ্রতিভ এক বালকের জন্ম হতে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার পাঠশালায় হাতেখড়ি নেয়া। বোন দূর্গার হাত ধরে যে প্রকৃতিকে চিনতে শিখেছিলো ছোট্ট অপু, সেই প্রকৃতির মাঝেই যেন জড়িয়ে গিয়েছে তার অস্তিত্ব। তিন খন্ডের ৩৫ পরিচ্ছেদে বিভক্ত ( ‘বল্লালী-বালাই’, ৬টি পরিচ্ছেদ ; ‘আম আঁটির ভেঁপু’, ৪টি পরিচ্ছেদ; ‘অক্রূর সংবাদ’, ৫টি পরিচ্ছেদ) বিস্তৃত উপন্যাসটি পড়লে মনে হতে পারে মাঝের চার পরিচ্ছেদই এর প্রাণ। কিন্তু মূল দৃশ্যপট অঙ্কনের জন্য এবং তিনটি যুগ-স্থান-পাত্র যথাযথভাবে প্রকাশ করবার জন্য ইন্দির ঠাকরুনের পরিণতি, এরপর অপুর সাথে দূর্গার ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা আর ইতিতে গ্রামের পাঠ চুকিয়ে শহুরে নতুন পরিবেশে এক নির্বোধ বালকের উপলব্ধি সবকিছুই ধারাবাহিক ও যুগপৎ আকর্ষণ। বিধবাদের প্রতি অনাচার-অবহেলা, গ্রামের যজমানি প্রথার ক্রূরতা, নিতান্ত সাধারণ ও অল্পদর্শী অভাবগ্রস্তা গৃহবধূর আপাত নিষ্ঠুর আচরণ এবং তার ছোট মেয়ের বিশাল মমতার পরিচয় দিয়ে বল্লালী-বালাই পর্ব সূচিত। “মানুষের আসা যাওয়ার মাঝে প্রকৃতিই কেবল নীরব নিঠুর দর্শক হয়ে সবকিছুকে জড়িয়ে রাখে। নগন্য জিনিসের মাহাত্ম্য ও উপযোগিতা ঢের বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। দরিদ্রতার কড়াল গ্রাসে বারবার আহত হয় আত্মমর্যাদা, তবু যুদ্ধ থামে না।” সবচেয়ে প্রাণ সঞ্চারী খন্ড আম আঁটির ভেঁপু। এতে তিলে তিলে বড় হয় অপু। আর তার নিষ্পাপ মন ও কৌতূহলী চোখ দিয়ে পাঠক দেখে সমাজের কঠিন কিছু প্রথা, কিছু রঙিন স্বপ্নবিলাসিতা, কিছু আহ্লাদিত অভিমান – সর্বোপরি মানবশিশুর দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে উন্মোচিত কঠিন বিশ্ব। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের আনাচে কানাচে ছুটে ফিরে দুই ভাই বোন আর তাদের বাবা-মায়ের চলে অফুরন্ত জীবন সংগ্রাম। এরই মাঝে তারা স্বপ্ন দেখে, আশাহত হয় আবার নতুন কল্পনার বীজ রোপণ করে। মানুষের আসা যাওয়ার মাঝে প্রকৃতিই কেবল নীরব নিঠুর দর্শক হয়ে সবকিছুকে জড়িয়ে রাখে। নগন্য জিনিসের মাহাত্ম্য ও উপযোগিতা ঢের বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। দরিদ্রতার কড়াল গ্রাসে বারবার আহত হয় আত্মমর্যাদা, তবু যুদ্ধ থামে না। ভাল-মন্দ, মমতা-পাষণ্ডতায় জড়ানো এক একটি চরিত্র যেন সমাজের মূর্ত প্রতিচ্ছবি। উপন্যাসের শেষ অংশে গ্রামীণ খেলাঘর ছেড়ে বাস্তবতার পাঠ নিতে শহুরে জীবন শুরু করা অপুর পদে পদে ঠোকর খাওয়া যেন বারবার এই-ই বলে যে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নিত্য চক্র শ্বাপদের ন্যায় উদ্যত। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরতাকে আশ্রয় করেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেন নিজ কলমের খোঁচায় প্রধান পাঁচটি চরিত্রের তিনটিকেই কেড়ে নিলেন। আর অদৃষ্টের খেয়ালী রসিকতাকে মূর্ত করে তুলতেই কী লেখক সব হারানো স্ত্রীলোকটির নাম দিয়েছিলেন ‘সর্বজয়া’? করুণ মৃত্যু, অসহায়ত্ব, কুটিলতা, অকৃত্রিম সরলতা, ক্ষুদ্র হতে বৃহৎ কপটতা, সীমাহীন দরদ আবার হৃদয়হীনতা, কখনো সৃষ্টিছাড়া উল্লাস, কোথাও আবেগী সম্প্রকাশে লেখক অনাড়ম্বর গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন উপন্যাসটিকে। বিভূতিভূষণ নিজেই বলেছেন, “করুণা ভালবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মশলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা হয়।” এখানে করুণা মানে দরদ- মমতা, উপন্যাসের প্রতিটি এককে রয়েছে যার জাঁকহীন বহিঃপ্রকাশ। রেলের থার্ড ক্লাস বগির বাদুর ঝোলা লোকটাও যে মহিমাময় চরিত্র হতে পারে, কিংবা গ্রামের পথে ছিন্ন পোশাক পড়া উষ্কখুস্ক চুলের মেয়েটি অপূর্ব দ্যোতনায়,গভীর অনুভূতিতে হৃদয়কে সিক্ত করে দিতে পারে তার প্রচ্ছন্ন ছবি এঁকে গেছেন লেখক একের পর এক। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “পথের পাঁচালী’ বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে।” পাঁচালী-ই বটে, পথেরই গান এটি। বনফুলের রেণু, আর ক্ষুদ্র ঘাসের মুকুলে যেখানে একাকার হয়ে আছে অতি সাধারণ জীবন আর অতি সূক্ষ্ম ভাববোধ। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে পাঠক খুঁজে পাবেন তার দীর্ঘকালের উপলব্ধি, আর পাবেন অপরাজিত এক স্পৃহা। যে স্পৃহার সৃষ্টি অপুর মনে, বনদেবতার অভয়বাণী ‘সামনে এগিয়ে যাওয়াই জীবন’ থেকে। উপন্যাস শেষে তাই গভীর জীবনবোধ, আর বিষণ্ন মমতায় ভেজা চোখে পাঠক পরের খণ্ডে খুঁজবেন ‘অপরাজিত’ অপুকে!"

Rayan Ahamed Rakib

Rayan Ahamed Rakib , Aug 7, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নামঃ পথের পাঁচালী লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় প্রকাশকঃ প্রিয়মুখ রিভিউ লেখকঃ রায়ান আহমেদ রাকিব পথের পাঁচালী’ প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লেখা একটি বিখ্যাত সামাজিক বাস্তব উপন্যাস। এটি উপন্যাস হলেও পড়ার সময় একটিবারের জন্যও মনে হয় না যে এটা উপন্যাস। বরং লেখকের স্বচ্ছ -সাবলীল ভাষায় আমাদের সমাজের বাস্তব ও জীবন্ত ছবিটিরই একটি সহজ-স্বাভাবিক রূপ তুলে ধরেছেন এই উপন্যাসে। #সারসংক্ষেপ তাকে মনে করিয়ে দেয়া হত যে সে একজন আশ্রিতা, করুণার পাত্রী ছাড়া আর কেউ নয়। সে প্রায়শই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত, কিন্তু দিন শেষে তার পথ এসে শেষ হত হরিহরের বাড়িতেই। একবার ঘটনাক্রমে বাড়ি থেকে তাকে একেবারে বের করে দেয়া হয় এবং মর্মান্তিকভাবে তার জীবনের ইতি ঘটে। মৃত্যু হয় অসহায়ত্বেরর। চিরাচরিত বাংলার বড়লোক-গরীবের বৈষম্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, যে একজন ব্রাক্ষ্মণ নারীর(সর্বজয়া) কি অবস্থা হয়, যখন অর্থের জন্য তাকে কাজের লোকের কাজ করতে হয়। দুর্গার মৃত্যুর পর তারা গ্রাম ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। সেখানে এক পর্যায়ে জ্বরে স্বামী হরিহরও মারা যায়। তার চোখের অশ্রু মোছার জন্যও কেউ ছিল না। সবাই তার কষ্টের সুযোগ নিতে চায়। সাহায্যের হাত কেউ বাড়ায় না। অবশেষে সে অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ছেলে অপুকে নিয়ে তার নিজ গ্রাম নিশ্চিন্দি পুরের পথে রওনা হয়। কিন্তু সে তার সঠিক পথ খুঁজে পায় না। এই সামাজিক বৈষম্য আজকের একবিংশ শতাব্দিতে এই উন্নত সমাজেও পরিলক্ষিত হয়। বস্তুত এই উপন্যাস আদি ও বর্তমান সামাজিক উত্থান-পতন ও সামাজিক কুসংষ্কারেরই প্রতিচ্ছবি। #পাঠ_প্রতিক্রিয়াঃ পৃথিবীর শ্রেষ্ট মধুর সম্পর্ক হচ্ছে ভাই বোনের সম্পর্ক। যেখানে আনন্দ বেদনা সবকিছু থাকে, একজন অন্যজনের বেদনায় কাতর হয়। সবসময় পথ চলার সঙ্গী হয়। বইটির প্রতিটি অংশের মাঝে মানবজীবনের উপখ্যানকে লেখক এক অনন্যরূপ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।"

Sumon AhmEd💙

Sumon AhmEd💙 , Aug 5, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নামঃ পথের পাঁচালী। লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রিভিউঃ মাসুদ রানা নিশ্চিন্দিপুরের এক ছোট্ট ভিটের স্বপ্নময় জীবনের গল্প পথের পাঁচালী। যেখানে নানা জাগতিক জটিলতায় জীবন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকলেও ভালোবাসার কমতি নেই। সংসারের টানাপোড়নে সর্বজয়ার মন কাঁদে বাচ্চাদের মুখে একটু ভালো মন্দ তুলে দেবার জন্য। শরীকরা ফিকির করে বাগানটাও দখল করে নিয়েছে। বাড়ির কর্তার এদিকে দোলচাল নেই। তিনি আছেন তার জগত নিয়ে। দস্যি দূর্গা সারাদিন বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়, ফল চুরি করে এনে পিসীকে দেয় আর ওদিকে বিচার যায় মায়ের কাছে। উত্তম মধ্যম পড়ার পরও কমে না তার দস্যিপনা। অপু দূর্গার একনিষ্ঠ ভক্ত। দিদির ফল পাকুড়ের ভাগ নেওয়া থেকে শুরু করে বড় মাঠের ওধারে রেলগাড়ি খুঁজতে যাওয়া সবকিছুর সঙ্গী সে। পাঠশালায় সবচেয়ে ছেলেমানুষ কিন্তু পড়াশোনায় বেশ। মিষ্টিওয়ালার পিছু নেয়া, দিদির চড়ুইভাতির সঙ্গী হওয়া সবকিছুতেই অপু কেমন মুখচোরা। তবে দূর্গার জন্য মায়াটা তার প্রচণ্ড। এই নিস্তরঙ্গ জীবনেও একদিন ঢেউ ওঠে। দূ্র্গার অসুখ ভালো হবার নাম নেই। সংসারে আয় রোজগার নেই। ভাগ্যের অন্বষণে শুরু হয় আরেক যাত্রা। সেখানে ফড়িং জীবন পিছনে ফেলে হাঁটতে হয় বাস্তবতার কঠিন পথে। আম আটির ভেপুঁ, ভাটফুল, আর বৈচির ঝোপ আর হাতছানি দিয়ে ডাকে না। হরিহরের চাঁদের হাট সংসারে ধেয়ে আসে কালো মেঘ। জীবনের সহজ সরল আনন্দময় মুহূর্তগুলোর পাশাপাশি উঠে এসেছে চরম সত্য কিছু বাস্তবতা। যা না চাইলেও মেনে নিতে মানুষ বাধ্য হয়। সামাজিক অবস্থান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নিজের অক্ষমতাকে। আবার আপনপরের হিসেব নিকেশ একপাশে রেখে বড় হয়ে উঠে মনুষ্যত্বের পরিচয়। এই বই পড়ে এমন কেউ নেই যে প্রকৃতির প্রেমে পড়বে না। সাধারণ একটা দৃশ্যেরও অসাধারণ বর্ণনা করেছেন লেখক। বইটা সবসময় আমার কাছে ‘কষ্টে মোড়ানো ভালোবাসা’ হয়ে থাকবে। একই সাথে ভালোলাগা আর হৃদয়ে রক্তক্ষরণের অনুভূতি দেয় ‘পথের পাঁচালী"

Jannatul Ferdous

Jannatul Ferdous , Aug 5, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নামঃ পথের পাঁচালী লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় প্রকাশনীঃ প্রিয়মুখ রিভিউ কারিঃ জান্নাতুল ফেরদৌস সুরভী বাংলা সাহিত্যের মধ্যে থেকে পাঠক মনে পরিপূর্ণ তৃপ্তি এনে দিতে পারে এমন অল্প সংখ্যক উপন্যাসের তালিকা তৈরি করা হয় তবে নিঃসন্দেহে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা কালজয়ী উপন্যাস "পথের পাঁচালী" সেই তালিকায় স্থান পাবে। দরিদ্রতায় জর্জরিত এক ব্রাহ্মণ পরিবারকে ঘিরে এই উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। উপন্যাসে প্রধান এবং অপ্রধান উভয় চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। প্রধান চরিত্রের মধ্যে রয়েছে সর্বজয়া, হরিহর, অপু, দুর্গা প্রভৃতি। উপন্যাসটি পড়ার সময় যে কেউ গ্রামের সহজ সরল উড়নচণ্ডী মেয়ে দুর্গার আড়ালে নিজেকে কল্পনায় হারাবেন। অপ্রধান চরিত্রের মধ্যে রয়েছে ইন্দির ঠাকুরুন (দূর সম্পর্কীয় পিসি), সেজো বউ, সখী ঠাকুরুন, অজয়, গোমস্তা প্রভৃতি। উপন্যাসটিকে ৩টি মূল উপশিরোনামে বিভক্ত করা যায়- ১) বল্লালী কানাই ২) আম আঁটির ভেঁপু ৩) অপুর সংবাদ উপন্যাসটির প্রথমদিকে দেখা যায়, দরিদ্র পরিবারের উপর বোঝা হিসেবে যখন হরিহরের দূর সম্পর্কীয় বোন ইন্দির ঠাকুরুন সেটে বসেন তখন আসলে স্বাভাবিক স্নেহের সম্পর্ক নিছক ম্লান বলে মনে হয়। উপন্যাসের প্রথম দিকে ইন্দির ঠাকুরুনের প্রতি দুর্গার মা সর্বজয়ার ব্যবহার একেবারেই মলিন ছিল। কথায় কথায় দারিদ্র্যতার কষাঘাতে বারেবারে সর্বজয়ার সকল রাগ গিয়ে ইন্দির ঠাকুরুনের উপর পড়ে। তবে ছোট মেয়ে দুর্গার এবং পিসি ইন্দিরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঘটনাটি বিপরীত। ইন্দির ঠাকুরুন সর্বজয়ার সাথে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলও দুর্গার জন্য পুনরায় ফিরে আসে। একদিন মনোমালিন্যের কারণে সর্বজয়া অকপটে বলে ফেলে, 'এবাড়িতে তোমার আর জায়গা হবে না।' সেদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ইন্দির ঠাকুরুনের জীবনাবসান ঘটে। উপন্যাসের দ্বিতীয় ধাপে বোন দুর্গা এবং ভাই অপুর শক্তিশালী এক সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। যে সম্পর্ক জগতের সব ছোট বাঁধাকে উপেক্ষা করতে পারে। চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে দুর্গা বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় প্রকৃতির যত দান তার সবটুকু কুড়িয়ে তৃষ্ণা মেটানোর তাগিদে। কখনো দুর্গা একা আবার কখনো অপুকে নিয়ে আমতলায় উঁকি দেয় কয়েকটা ঝরে পড়া ফল কুঁড়াবে বলে। মাঝে মাঝে গাছতলার ফল কুঁড়ানো নিয়েও পাড়ার ছেলে-বুড়োর সাথে অপু-দুর্গার মনোমালিন্য ঘটে। ঠিক যেমন বৈশাখের আম-কাঁঠালের দিনের গ্রামের বাস্তব কোনো চিএ। চঞ্চল দুর্গা সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায় বলে মায়ের অনেক অভিযোগ। তবুও দুর্গা ছুটে যায় বনে বাদাড়ে। পাড়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এই ছোট্ট মেয়েটিকে পাড়ার সকলে ভালোবাসতো। একদিন দুর্গা অপুর মুখে রেলগাড়ি সম্পর্কিত বিশেষ বর্ণনা শুনে রেলগাড়ি দেখার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে। তারা সকলের অগোচরে বাছুর খোঁজার ছুতোয় রেলগাড়ি দেখতো বেরোয়। তারা মাঠের পর মাঠ পেরোলেও রেলগাড়ির দেখা পায় না। বেলা শেষে তারা বাড়ি ফিরে আসে। দুর্গার মনে আসা জেগে উঠে একদিন ঠিকি সে রেলগাড়ি দেখতে পাবে। তারপর অসুস্থ দুর্গা অপুর কাছে আবদার করে, -"শোন্ অপু- একটা কথা শোন্! আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি?" কিন্তু দুর্গার আর রেলগাড়ি দেখা হয়ে উঠে না। ম্যালেরিয়ার শেষ স্টেজে ভুগতে থাকা দুর্গা প্রাণবায়ু নিঃশেষ করে পরপারে চলে যায়। পরিবারের এক সদস্যের অকাল মৃত্যুর পর তারা গ্রাম ত্যাগ করে অন্যএ চলে যায়। সেখানে এক পর্যায়ে অন্য এক সদস্য জ্বরে মারা গেলে তার চোখের অশ্রু মোছার জন্য কেউ ছিল না। নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে গল্প এগোতে থাকে। সেসব বর্ণনা পাঠকদের জন্য তোলা রইলো। বইপ্রেমী, সাহিত্যপ্রেমী এবং সমাজপ্রেমীরা এই কালজয়ী উপন্যাসটি পড়তে পারেন।"

Md Atiar Rahman

Md Atiar Rahman , Aug 3, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বই : পথের পাঁচালী লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রিভিউ কারি: মোঃ আতিয়ার রহমান পথের পাঁচালী একটি প্রকৃতি নির্ভর উপন্যাস।বিভূতিভূষনের প্রকৃতির প্রতি যথেষ্ট প্রেম থাকায় তৎকালীন সকল বিষয় উপেক্ষা করে চিরস্থায়ী, চিরসাক্ষী এবং একটি পরিপূর্ণ সত্তা নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলম্বন করে লিখতে বসে গেলেন পথের পাঁচালী। হ্যাঁ, পাঁচালীই বটে, জীবন পথের চলমান সংগিত। বলা হয়ে থাকে পথের পাঁচালীতে প্রকৃতির বর্ননায় জীবনানন্দ দাশের কাব্যময়তা না থাকলেও আছে ছন্দময়তা। রাংচিতা, গুড়কলমী, রঙ্গিন মাকালফল, গ্রাম্য বধূর ভিজে পায়ের ছাপ, কাশবন, পদ্মঝিল এসব প্রকৃতির নিখুঁত বর্ননার সাথে যুক্ত হয়েছে দরিদ্র কবলিত এক পরিবারের উপাক্ষান।নিশ্চিন্তপুর গ্রামের ব্রাম্মন রায় পরিবারের দারিদ্রের সংগ্রাম, গ্রামীন সংস্কারের আড়ম্বরতা, এরোই মাঝে সপ্রতিভ এক বালকের জন্ম হতে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা আর নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পাঠশালায় হাতেখড়ি নেয়া। বোন দূর্গার হাত ধরে ছোট্ট অপু প্রকৃতিকে চিনতে শিখেছিল এবং সেই প্রকৃতির মাঝেই যেন‌ জরিয়ে গিয়েছিল তার অস্তিত্ব। উপন্যাসে সবচেয়ে প্রাণ সঞ্চারী খন্ড হচ্ছে আম আঁটির ভেপু। এতে তিলে তিলে বড় হয় অপু। দূর্গা ও অপু নামক কিশোর-কিশোরি তাদের অপার বিস্ময়, দুরন্তপনা আর তাদের অনুসন্ধিৎসু চোখের অবাক করা নিশ্চূপ দৃষ্টি দিয়ে মাতিয়ে রাখে প্রকৃতিকে। পাঠক অপুর নিষ্পাপ মন ও কৌতূহলি চোখ দিয়ে দেখে সমাজের কঠিন কিছু প্রথা, কিছু রঙ্গিন সপ্নবিলাসিতা, কিছু আহ্লাদি অভিমান। সর্বপরি অপুর চোখে ধীরে ধীরে উম্মোচিত হয় কঠিন বিশ্ব। গ্রামের আনাচে কানাচে ঘুরে বেরানো, দুজন মিলে সময় করে রেলগাড়ি দেখতে যাওয়া, কাশবনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এসব করতে করতে তাদের সময় কাটে। অপর দিকে তাদের বাবা মায়ের চলে অফুরন্ত জীবন সংগ্রাম। জীবন সংগ্রামে তারা সপ্ন দেখে, আশাহত হয়, আবার নতুন করে আশার বীচ বোপন করে। দারিদ্রের কড়াল গ্রাসে বারবার আহত হয় আত্মমর্যাদা, তবু যুদ্ধ থামে না। উপন্যাসে সময়েতে প্রতিবেশীর কঠিন ব্যবহার আবার খারাপ সময়ে সেই প্রতিবেশীরোই করুনাময় ব্যবহার দেখিয়ে ভালোবাসাময় এক সমাজ তুলে ধরা হয়েছে। বিভূতিভূষণ নিজেই বলেছেন, করুনা হলো ভালোবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মসলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা। এখানে করুনা মানে দরদ, মমতা। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রে রয়েছে যার জাকহীন বহিঃপ্রকাশ। তিনটি যুগ-স্থান-পাত্র যথাযথ বুঝানোর জন্য ইন্দির ঠাকুরুনের পরিনতি, এর পর দূর্গার সাথে আপুর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা আর ইতিতে গ্রামের পাঠ শেষ করে শহুরে নতুন পরিবেশে এক নির্বোধ বালকের উপলব্ধি সবকিছুই ধারাবাহিক ও যুগপৎ আকর্ষণ। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে পাঠক খুঁজে পাবেন অপরাজিত এক স্পৃহা। যেটার সৃষ্টি হয়েছে অপুর মনে বনদেবতার অভয়বাণী সামনে এগিয়ে যাওয়া জীবন থেকে। উপন্যাসটি শেষ করে পাঠক গভীর জীবনবোধ আর বিশন্ন মমতায় ভেজা চোখে খুঁজবে পরের খন্ড অপরাজিত অপুকে। পুনশ্চ: উপন্যাসটি ১৯২৯ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৫৫ সালে কালজয়ী নির্মাতা সত্যজীৎ রায় এটাকে সিনেমায় রূপ দেন। যেই সিনেমা পরে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার অস্কার জয়ী হয়।"

Labiba Ibnat

Labiba Ibnat , Aug 3, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_bookclub_review_2021 #রিভিউঃপ্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত "পথের পাঁচালী" একেবারেই ব্যাতিক্রমধর্মী একটি উপন্যাস।এটি শুধু একটি উপন্যাসই নয়, বরং একটি জলজ্যান্ত চিত্র যা উপ্যাসের পরিধি ছাড়িয়ে বহুদূর এগিয়ে গেছে। এটির মৌলিকতা ও সরসতা আধুনিক বাংলা উপন্যাসের গতানুগতিশীলতার মধ্যে একটি পরম বিস্ময়াবহ আবির্ভাব। শুধুমাত্র কিশোর-কিশোরীরা নয়, বড়োরাও এই উপন্যাসটি পড়ে যেন মায়ার রাজ্যে হারিয়ে যাবেন।আর যারা প্রবীণ তাদের শৈশবকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে নিশ্চিন্দিপুরের তেজস্বী বালিকা দুর্গা এবং অবোধ বালক অপু। সমগ্র উপন্যাসটি মোট তিনটি খণ্ড ও পঁয়ত্রিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। খণ্ড তিনটি যথাক্রমে বল্লালী বালাই (পরিচ্ছেদ ১-৬; ইন্দির ঠাকরূনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে), আম-আঁটির ভেঁপু (পরিচ্ছেদ ৭-২৯; অপু-দুর্গার একসাথে বেড়ে ওঠা, চঞ্চল শৈশব, অপুর সপরিবারে কাশীযাত্রা চিত্রিত হয়েছে) এবং অক্রূর সংবাদ (পরিচ্ছেদ ৩০-৩৫; অপুদের কাশীজীবন, হরিহরের মৃত্যু, সর্বজয়ার কাজের জন্য কাশীত্যাগ এবং পরিশেষে নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে আসার কাহিনী বর্ণনা হয়েছে।) । গ্রন্থের প্রথম খন্ডে অপুর এক দূরসম্পর্কীয় বৃদ্ধা পিসি ইন্দির ঠাকরুনীর লাঞ্চনা আর দুর্গতির করুন ইতিহাস আমাদের সবার চোখের সামনে ভেসে উঠবে।নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের মেয়ে ইন্দির ঠাকরুনের এমন এক লোকের সাথে বিয়ে হয় যে যৌতুকের লোভে অন্যত্র বিয়ে করে আর ফিরে আসেনা।ঘটনাচক্রে তার স্থান হয় হরিহরের বাড়িতে।সেখানেও তাকে জীবনের নির্মম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এই অংশেই অপু জন্মগ্রহণ করে যা তার দিদি দুর্গার মনে সানন্দ বিস্ময়ের ভাব জাগায়।মূলত এই খন্ডটিতে পাঠক খুঁজে পাবেন যৌতুক প্রথা ও কৌলীন্যপ্রথাবিড়ম্বিত পরিবার ব্যবস্থার যুগে একজন নারীর অসহায়ত্বের পাশব চিত্র। পরের অংশ "আম আঁটির ভেঁপু" যেন উপন্যাসটির প্রাণ।আম খাওয়ার পর আমের আঁটি ফেলে দিলে তা কিছুদিন পর শুকিয়ে যায়।শুকনো অংশের ভিতরে আরেকটি কচি অংশ পাওয়া যায়।যেটি দিয়ে গ্রামের বাচ্চারা একধরনের ভেঁপু বা বাঁশি বানায়, সেটিই হচ্ছে আম আঁটির ভেঁপু।গ্রামে থাকার সুবাদে এটি দেখেছিলাম ছোটবেলায়।জানিনা সবার এই ভেঁপু দেখার সুযোগ হয়েছে কিনা! দ্বিতীয় খন্ডটিকে 'আম আটির ভেঁপু' নামকরনের মাধ্যমে হয়তো লেখক বোঝাতে চেয়েছেন চিরায়ত পল্লিগ্রামের বালক বালিকাদের জীবনকাহিনী, যারা আম আঁটির ভেঁপুর মতো সামান্য খেলনাতেই তুষ্ট। দুই ভাই বোনের ছুটে চলা,তাদের খুনসুটি,রেলগাড়ি দেখতে চাওয়ার মতো ছোট ছোট আশা,রাস্তার ধারের টক ফলমূল খেয়ে তৃপ্তি লাভ করা, খাপড়ার কুচি ও রেড়ি ফলের বিচির মতো সামান্য জিনিস অতি যত্নে টিনের কৌটোয় সংরক্ষণ করা,আনন্দের সাথে গ্রাম্য মেলায় ঘুরতে যাওয়া এসবকিছুর মাঝে পাঠক খুঁজে পাবেন পল্লিগ্রামের শৈশবের এক প্রাণবন্ত রূপ। এই খন্ডে অপুর শৈশব জীবনের আশা-কল্পনা ও ক্রীড়া-কৌতুকের অতি বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়।এই অংশে নায়িকা হলো অপুর দিদি দুর্গা। দুর্গার চরিত্রে প্রখর অধিনায়কত্ব, তীক্ষ্ন মৌলিকতা, নির্ভীক বিচরণ-স্পৃহা, নতুন নতুন খেলা উদ্ভাবনের শক্তি ও স্বাবলম্বনপ্রিয়তা আছে, যা পাঠককে বিস্মিত করবে।লেখক তাকে আদর্শবানের দ্বারা বিন্দুমাত্র রূপান্তরিত করেনি।বরং তার মধ্যে দরিদ্র গ্রাম্য বালিকার লোভাতুরতা,আত্নসম্মানজ্ঞানের অভাব,এমন কি প্রলোভনের বশে চুরি করবার প্রবৃত্তিও আছে। দোষত্রুটি সত্বেও তার অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা পাঠকের মনে চিরপ্রিয়,শৈশব-চাপল্যের চিরন্তন প্রতীক হয়ে থাকবে।দিদি দুর্গা অপুর হাত ধরে ছন্দময় প্রকৃতির রহস্যময় নির্জনতার অন্তঃপুরে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গেছে।কিন্তু সে নিজে অপুর মতো প্রকৃতির সাথে নিবিড় একাত্মতা অনুভব করেনি।কল্পনাপ্রবণতা,প্রকৃতির ইন্দ্রজালের অনুভুতি ও মন ব্যাকুল করা হাতছানি অপুর নিজস্ব আবিষ্কার।নিশ্চিন্দপুরের প্রকৃতির প্রাণস্পন্দন অপুকে কাছে টানে।গ্রামের দুধারের প্রকৃতিকে সে প্রান ভরে দেখে,প্রকৃতির সাথে যেন তার নাড়ির সংযোগ।প্রকৃতির সমস্ত রুপ রস অপুর দৃষ্টিতে পাঠক দেখতে পাবেন।ইছামতী নদী,রাংচিতা,মাকাল ফল,রেড়ি ফল, কাশবন,পদ্মঝিল, দেয়ালের ফাটলে গজানো পরগাছা,সোঁদালি,গুড়কলমী,রাস্তার ধারের ঘেঁটু ফুল,মাটির ভিজে গন্ধ কোনো কিছুই যেন অপুর কৌতুহলী চোখ এড়াতে পারেনি।অপুর গভীর অন্তদৃষ্টির মাধ্যমে বিভূতিভূষণ প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রসভান্ডার উন্মুক্ত করেছেন।প্রত্যেকটি চরিত্র তিনি গভীর মমতায় কল্পনার রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।যাদের মাধ্যমে পাঠক পাবেন এক করুন রসের স্বাদ। হরিহরের দরিদ্র পরিবারে সর্বজয়া যেন পল্লীগ্রামেরই এক দুঃখিনী গৃহীনি ও মায়ের প্রতীক।গ্রামের আনাচে কানাচে ছুটে বেড়ায় দুই ভাইবোন আর তাদের বাবা মায়ের চলে অফুরন্ত জীবন সংগ্রাম।দরিদ্রের করাল গ্রাসে বার বার তারা আহত হয়।তবু থেমে থাকে না নতুন করে আশার বীজ বোনা।এই অধ্যায়েই সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম ঘটনা ঘটে।যা পড়ে পাঠক কাঁদতে বাধ্য। সর্বশেষ অধ্যায়ে হরিহর সবকিছু পানির দামে বেঁচে সপরিবারে কাশী চলে যায়।সেখানে সবকিছু ভালোই চলছিল কিন্তু হঠাৎ হরিহর নিউমোনিয়ায় মারা যায়।অসহায় হয়ে পরে তারা।কোনো উপায় না পেয়ে সবর্জয়া এক ধনী পরিবারে রাধুনীর চাকরি নেয়।সেখানেও পদে পদে লাঞ্চিত ও অপমানির হতে হয় তাকে।রাধুনির ছেলে হয়ে পরিবারের ছেলেদের সাথে মেশার অপরাধে মার খেতে হয় অপুকে। দুঃখে ফেটে যায় সর্বজয়ার মন,কিন্তু তার কিছুই করার থাকেনা।মনে পড়ে যায় তার নিশ্চিন্দিপুরের কথা।অপু একদিন বড় হয়ে রোজগার করবে,তখন সকল কষ্ট দূর হবে তাদের, এই স্বপ্নে বিভোর থাকে সর্বজয়ার মন।অবশেষে সে অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নিজ গ্রাম নিশ্চিন্দিপুরের পথে রওনা হয়, কিন্তু সে পথ খুঁজে পায় না। এই অমর উপন্যাসটি পড়া শেষে চোখ বুঝলেই আমরা দেখতে পাবো অপু ও দুর্গা গ্রামের পথ ধরে দৌড়াচ্ছে আর দুর্গার উস্কোখুস্কো চুল বাতাসে উড়ছে।উপন্যাসটি পড়েছিলাম ৮ম শ্রেনীতে।এটি পড়ার পর অনেক কেঁদেছিলাম আর মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষটির নাম হলো বিভূতিভূষণ। কখনো ইন্দির ঠাকরুন,কখনো সর্বজয়া,কখনো অপু-দুর্গার দুঃখের কাহিনী পড়ে চোখের জল থামিয়ে রাখতে পারিনি।একজন মানুষ কীভাবে তার লেখার মাধ্যমে এতো কষ্ট দিতে পারে?এই উপন্যাসটি না পড়লে বুঝতাম না। উপন্যাসটি পড়ার কিছুদিন পরও ভুলতে পারিনি সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি(সেটি বললাম না,পাঠক নিজে পড়ে খুঁজে নেবেন)।এতো কিছুর পরেও কেউ যখন জানতে চায় আমার সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস কোনটি, মুহুর্তেই বলি "পথের পাঁচালী"।উপন্যাসটির একের পর এক ঘটনা পাঠকের মনে এক অদ্ভুত অনুভূতির শিহরণ জাগাবে বলে আমি মনে করি।উপন্যাসটি সম্পর্কে ডঃ সৌমিত্র শেখর বলেছেন, “বিভূতিভূষণ দরিদ্র চরিত্রগুলোর সমাবেশ ঘটিয়ে কোন দুঃখগাঁথা তৈরি করতে চাননি। অথবা চান নি প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি বিপ্লব ঘটাতে। তিনি যুগের অস্থিরতায় না জড়িয়ে আবহমানকালের চিরস্থায়ী, চিরসাক্ষী এবং একটি পরিপূর্ণ সত্তা নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলম্বন করলেন এ উপন্যাসে।” অপুর চরিত্রে একপ্রকার উদার আসক্তিহীনতা, স্নেহ মায়ার করুন রহস্য ও চঞ্চল অগ্রগমনশীলতা আছে যা পাঠক কে পরের খন্ডে নিয়ে যাবে "অপরাজিত" অপুকে খুঁজতে। বইয়ের নামঃপথের পাঁচালী লেখকঃবিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ক্যাটাগরিঃচিরায়ত উপন্যাস প্রকাশনীঃপ্রিয়মুখ মুল্যঃ১৭৪ টাকা রিভিউকারীঃলাবিবা ইবনাত"

Mujahid Hasan

Mujahid Hasan , Aug 1, 2021

★ ★ ★ ★ ★

"#priyomukh_Progoty_book_club_review_2021 বইয়ের নাম: পথের পাঁচালী লেখকের নাম: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ক্যাটাগরিঃ বুক রিভিউ রিভিউকারীঃ মোঃ মুজাহিদ হাসান সিফাত লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ কাব্যময় গদ্য ও চিত্রাত্মক বর্ণনায় সমৃদ্ধ রচনা কোন ঔপন্যাসিকের বৈশিষ্ট্য জিজ্ঞেস করলে প্রথমেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম আসবে।  তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার - ১৯৫১ (মরণোত্তর), ইছামতী উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার পারমাদান বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নাম লেখকের সম্মানার্থে রাখা হয়েছে "বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য"। পথের পাঁচালী উৎসর্গঃ পথের পাঁচালী (১৯২৯) উৎসর্গ করা হয়েছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতৃদেবকে। সূচনাঃ কিছু বই আছে যেগুলো কথা বলতে পারে। একজন পাঠকের বই পড়ার আনন্দ বহু গুণ বেড়ে যায়, যখন কোনো বই তার সাথে কথা বলতে শুরু করে। বইটিকে তখন খুব কাছের বন্ধু বলে মনে হয়। গড়ে ওঠে পাঠক এবং বইয়ের এক নিবিড় সম্পর্ক। 'পথের পাঁচালী'  বইটি যে শুধু পাঠকের সাথে কথা বলতে পারে, সেটাই না। বরং খুব সুন্দর ও সফলভাবে পাঠকের কাছে প্রয়োজনীয় বার্তাও পৌঁছে দিতে পারে। মহান শিল্পী গোর্কি বলেছেন- 'মেহনতই সমস্ত শিল্পকলার উৎস'। চরিত্রঃ 'অপু'  চরিত্রটিই 'পথের পাঁচালী' র প্রধান চরিত্র এবং এটি বিভূতিভূষণেরই শৈশব। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাল্য ও কৌশোরকাল দরিদ্রতায় কাটে। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী' তে 'অপু'  চরিত্রের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরেছেন। অপু ছাড়াও অপুর বোন 'দূর্গা', মা 'সর্বজয়া', বাবা 'হরিহর' এবং 'ইন্দিরঠাকুরন' কে ঘিরে উপন্যাসটি ফুটে উঠেছে। সার সংক্ষেপঃ 'পথের পাঁচালী'  উপন্যাসটি তিনটি খণ্ড ও মোট পঁয়ত্রিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। বল্লালী বালাইঃ পরিচ্ছেদ ১-৬; এই উপন্যাসের প্রথম অংশে আমরা দেখি ইন্দিরঠাকুরনের বিয়ে। অল্পবয়সে এমনই এক লোকের সাথে দেয়া হয়, যে বেশি যৌতুকের লোভে অন্যত্র বিয়ে করেন। আম-আঁটির ভেঁপুঃ পরিচ্ছেদ ৭-২৯; এই উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশ ‘আম আঁটির ভেঁপু’ এ অত্যন্ত সুচারুভাবে সর্বজয়ার সন্তানদ্বয় বড়মেয়ে দূর্গা ও ছোট ছেলে অপুর দুষ্টুমির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। অপু-দুর্গার একসাথে বেড়ে ওঠা, চঞ্চল শৈশব পাওয়া যাবে এ অংশে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে জ্বরের কারণে দুর্গা মারা যায়। অক্রূর সংবাদঃ পরিচ্ছেদ ৩০-৩৫; উপন্যাসের শেষ অংশ  বাংলার বড়লোক-ছোটলোকের বৈষম্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। হরিহরের মৃত্যু, সর্বজয়ার কাজের জন্য কাশীত্যাগের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। বইটির ভালো দিকঃ দুই ভাইবোন অপু আর দুর্গার বেড়ে ওঠা তাদের পরিবারের গল্প নিয়েই বিখ্যাত 'পথের পাঁচালী' উপন্যাস। বইটি ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় এবং এটিই ছিলো বিভূতিভূষণের প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস। বিভূতিভূষণ তাঁর সাহিত্যে প্রকৃতি ও মানব জীবনকে অবিচ্ছিন্ন সত্তায় ধারন করেন। তাঁর রচনা শুধু প্রাকৃতিক বর্ণনা নয়, এতে রয়েছে গভীর জীবনবোধ। বইটিতেও পাওয়া যায় প্রকৃতির সৌন্দর্য ও গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের চিত্র। বইটির খারাপ দিকঃ 'পথের পাঁচালী'  বইটি পড়তে অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ এটি সাধু ভাষায় রচিত উপন্যাস। তাই সবার মন মতো নাও হতে পারে। বই সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামতঃ প্রথমেই বলবো আমার জীবনের সেরা উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'  বইটি। সব যদি বলেই দেয় তবে সেটা কি রিভিউ থাকলো? রিভিউ এমন হতে হয় যাতে পাঠক যে কোন বই সম্পর্কে আগ্রহ পায়। আগ্রহ সৃষ্টি করে দেওয়ায় আমার কাজ, বই সম্পর্কে আপতত আমার কোন মতামত নেই। 'পথের পাঁচালী' কেন পড়বেনঃ এই উপন্যাসটির পটভূমি গ্রামবাংলার প্রকৃতি। নিজেই এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন -‘পথের পাঁচালীর গ্রাম্য চিত্র গুলি সবই আমার স্বগ্রাম ব্যারাকপুর’। নিজেকে অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলে ভাবুন, দিয়ে পড়া শুরু করুন। গ্রামবাংলায় হারিয়ে যাবেন। একের পর একেক ঘটনা আপনাকে পুরো উপন্যাস টি শেষ করতে বাধ্য করবে। আমি এতোটুকু বলবো, পড়ুন উপন্যাসটি। হতাশ হবেন না। আর যদি পড়ে থাকেন তবে নিশ্চিত আপনারও পছন্দের উপন্যাস হবে 'পথের পাঁচালী' । বই রহস্যঃ বইটির বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল– “প্রকৃতির স্বাধীন আবহাওয়া একটি শিশুচিত্তকে কীভাবে সংসার সংগ্রামের উপযোগী করিয়া তুলিতেছে তাহারই বিচিত্র ইতিহাস অপরুপ ভঙ্গিতে বলা হইয়াছে।'' সেরা কথোপকথনঃ এই শোন... - কি রে? - এবার জ্বর ছাড়লে রেলগাড়ী দেখাতে নিয়ে যাবি? - আগে তুই সেরে ওঠ তো  দিকি। শেষ কথাঃ 'পথের পাঁচালী'  উপন্যাসটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘এর থেকে শিক্ষা কিছুই হয়নি, দেখা হয়েছে অনেক- যা পূর্বে এমন করে দেখিনি’।"

shahajadi Jabunnasa

shahajadi Jabunnasa , Jul 2, 2021

★ ★ ★ ★ ★
যাচাইকৃত মূল্যায়ন

"সব বই বিক্রি হয়"

প্রশ্ন ও উত্তর (Q&A)

2 টি

বইটি সম্পর্কে পাঠক ও ক্রেতাদের সাধারণ জিজ্ঞাসা এবং প্রগতি সাপোর্ট টিমের নির্ভরযোগ্য উত্তর

Q

কত পৃষ্ঠা

880****855 • 27 May, 2026
A
প্রিয় গ্রাহক, বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা 240। ধন্যবাদ।
প্রগতি সাপোর্ট টিম • 27 May, 2026
Q

এখানে কি পুরো উপন্যাস আছে?

মাইশা মিশকাত • 26 May, 2026
A
জি পুরো উপন্যাস আছে।
Priomukh • 26 May, 2026

সম্পর্কিত অন্যান্য বই

সবগুলো দেখুন →
ময়ূরাক্ষী
একটু পড়ে দেখুন
ময়ূরাক্ষী হুমায়ূন আহমেদ
(277)
TK. 225 -20% OFF
TK. 180
তোমাকে
একটু পড়ে দেখুন
তোমাকে হুমায়ূন আহমেদ
(186)
TK. 225 -20% OFF
TK. 180
হিমু সমগ্র
একটু পড়ে দেখুন
হিমু সমগ্র হুমায়ূন আহমেদ
(314)
TK. 1,000 -20% OFF
TK. 800
মিসির আলি সমগ্র ২
একটু পড়ে দেখুন
মিসির আলি সমগ্র ২ হুমায়ূন আহমেদ
(143)
TK. 500 -20% OFF
TK. 400
হিমু সমগ্র ২য় খণ্ড
একটু পড়ে দেখুন
হিমু সমগ্র ২য় খণ্ড হুমায়ূন আহমেদ
(116)
TK. 600 -20% OFF
TK. 480
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
একটু পড়ে দেখুন
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ হুমায়ূন আহমেদ
(69)
TK. 160 -14% OFF
TK. 138
তিনি ও সে
একটু পড়ে দেখুন
তিনি ও সে হুমায়ূন আহমেদ
(34)
TK. 135 -20% OFF
TK. 108
শুভ্র সমগ্র
একটু পড়ে দেখুন
শুভ্র সমগ্র হুমায়ূন আহমেদ
(90)
TK. 600 -20% OFF
TK. 480

বইটির রিভিউ লিখুন

আপনার রিভিউ ও রেটিং সফলভাবে জমা নেওয়া হয়েছে!

ধন্যবাদ আপনার মতামতের জন্য।

বইটি সম্পর্কে প্রশ্ন করুন

আপনার প্রশ্নটি সফলভাবে জমা নেওয়া হয়েছে!

আমাদের সাপোর্ট টিম দ্রুত উত্তর প্রদান করবে। উত্তর দেওয়া হলে তা এই বইয়ের পাতায় প্রদর্শিত হবে।

"পথের পাঁচালী" বইটি সম্পর্কে আপনার যা জানার আছে লিখুন। আমাদের সাপোর্ট টিম দ্রুত উত্তর দেবে।

লগইন বা একাউন্ট প্রয়োজন

রিভিউ, রেটিং ও প্রশ্ন করার জন্য একটি একাউন্ট খুলে নিন অথবা আপনার একাউন্টে লগইন করুন।

বইটি ডেলিভারি পাওয়ার পর রিভিউ দিন

সঠিক ও নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নের সুবিধার্থে আমাদের ওয়েবসাইটে শুধুমাত্র বইটি কিনে সফলভাবে ডেলিভারি পাওয়ার পরেই রিভিউ বা রেটিং প্রদান করা যায়।

বইটি শেয়ার করুন

বন্ধুদের সাথে এই বইয়ের তথ্য শেয়ার করতে পারেন

বইয়ের কিছু অংশ পড়ুন

পাতা:

পাতা 1
পথের পাঁচালী পাতা: 1 / 9
পাতা 2
পথের পাঁচালী পাতা: 2 / 9
পাতা 3
পথের পাঁচালী পাতা: 3 / 9
পাতা 4
পথের পাঁচালী পাতা: 4 / 9
পাতা 5
পথের পাঁচালী পাতা: 5 / 9
পাতা 6
পথের পাঁচালী পাতা: 6 / 9
পাতা 7
পথের পাঁচালী পাতা: 7 / 9
পাতা 8
পথের পাঁচালী পাতা: 8 / 9
পাতা 9
পথের পাঁচালী পাতা: 9 / 9
পাতা / 9
এই তথ্যটি জেনে রাখুন।

প্রগতি একটি নতুন প্লাটফর্ম হওয়ায় এখনো আমাদের কোনো ওয়ারহাউজ নেই। তাই আমরা রকমারির মাধ্যমে পন্য পাঠাবো। তবে এতে আপনার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবেনা।